৬ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃক লাইসেন্স বাতিলের মাত্র দুদিনের মাথায় আজ সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী আদ-দ্বীন হাসপাতাল। সকাল থেকেই হাসপাতালের বহির্বিভাগ (OPD), জরুরি বিভাগ এবং ইনডোর সেবাসহ অধিকাংশ চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। হঠাৎ করেই চিকিৎসা সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হাসপাতালের গেটে এসে চরম অসহায়ত্ব ও ভোগান্তির মুখোমুখি হচ্ছেন।
আজ সোমবার সকালে সরেজমিনে মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রধান ফটকগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। লাইসেন্স বাতিলের পর থেকে হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ কর্মচারীরা কর্মহীন অবস্থায় হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে অপেক্ষা করছেন। কোনো কোনো কর্মচারীকে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। হঠাৎ হাসপাতালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের চাকরি ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে উল্লেখ করে, দ্রুত হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান তাঁরা।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) লাইসেন্স বাতিলের পর স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে চিকিৎসাধীন রোগীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের জন্য ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকেই আইসিইউ ও সাধারণ ওয়ার্ডে থাকা মুমূর্ষু রোগীরা অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিকেল, পিজি হাসপাতালসহ অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে চলে যেতে বাধ্য হন।
ঈদুল আজহার আগের দিন, গত ২৭ মে ভোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে মাত্র ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ৬টি নিষ্পাপ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই গণ-মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে ঘটনার দিনই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
গত ৪ জুন তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তদন্তে হাসপাতালের চরম ও ক্ষমার অযোগ্য অবহেলার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা মূল কারণগুলো ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ:
- দমবন্ধ পরিবেশ ও এসির ত্রুটি: আদ-দ্বীন হাসপাতালের যে ভবনটিতে নবজাতকদের রাখা হয়েছিল, সেটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। সংশ্লিষ্ট পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় ধরে সেন্ট্রাল এসি (AC) বিকল বা বন্ধ ছিল। কোনো স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কক্ষটিতে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয় এবং ক্ষতিকারক কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়ে শিশুদের দম বন্ধ হয়ে যায়।
- ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড়: মাত্র ৯০০ বর্গফুটের ওই সংবেদনশীল কক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি (প্রায় ৫০ জন) স্বজন ও বহিরাগত মানুষের উপস্থিতি ছিল, যা শিশুদের ইনফেকশন ও শ্বাসকষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।
- চিকিৎসকহীন ওয়ার্ড ও নার্সদের নির্মমতা: তদন্তে আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার যখন দ্রুত অবনতি হচ্ছিল, তখন হাসপাতালে কোনো ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স’ বা জরুরি সাড়াদানের ব্যবস্থা ছিল না। অন-ডিউটি কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসক সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি ছটফট করতে থাকা শিশুদের বাঁচাতে দায়িত্বরত সেবিকারা (নার্স) চরম অবহেলা, নিষ্ক্রিয়তা ও ভুক্তভোগী মায়েদের সাথে অমানবিক অসহযোগিতা করেছিলেন।
এই লোমহর্ষক তদন্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কেন ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ লঙ্ঘনের দায়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে না—তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর (Showcause) নোটিশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া লিখিত জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ১১ জুন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলপূর্বক সিলগালা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
