কুষ্টিয়া সীমান্তে পুশ-ইন উত্তেজনা: ১২ নারী-পুরুষকে ‘ভারতীয় নয়’ দাবি বিএসএফের, কড়া জবাব দিল বিজিবি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) অবস্থান করা ৪ শিশুসহ ১২ জন নারী-পুরুষ ‘ভারতীয় নাগরিক নয়’ বলে দাবি করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)। আজ শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত দুই দেশের এক জরুরি পতাকা বৈঠকে বিএসএফ এই দাবি উত্থাপন করে। তবে বিএসএফের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) তাদের কড়া ও কঠোর বার্তা দিয়েছে। বিজিবি সাফ জানিয়ে দিয়েছে—এই পুশ-ইনের অপচেষ্টা খোদ বিএসএফ করেছে, তাই এই মানুষগুলোর নিরাপত্তার দায় ও নিশ্চয়তা সম্পূর্ণ বিএসএফকেই নিতে হবে।

আজ শনিবার (১৩ জুন, ২০২৬) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্রাগপুর সীমান্তের ১৫০/৩-এস পিলারের কাছে দুই দেশের এই পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আধা ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠক শেষে বিএসএফের প্রতিনিধি দল তাদের সীমানায় ফিরে যায়। প্রাগপুর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে এই পতাকা বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আজ শনিবার বিকেল ৪টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুশ-ইনের শিকার ওই ১২ জন অসহায় মানুষ সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে একটি পাটখেতের আইলে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। গতকাল শুক্রবার তাঁরা যেখানে ছিলেন, সেখান থেকে মাত্র কয়েক গজ সামনে পিলারের দিকে একটি শিমুলগাছের নিচে তাঁরা বসে আছেন।

টানা দুদিন ধরে সীমান্তে আটকে থাকায় এবং তীব্র গরমে শারীরিকভাবে তাঁরা সবাই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে চারজন নিষ্পাপ শিশু প্রচণ্ড রোদে ও গরমে ঢলে পড়েছে। শূন্যরেখায় অপেক্ষমাণ শিশুদের এই করুণ অবস্থা দেখে মাঠের এক সাধারণ বাংলাদেশি কৃষককে ডুকরে কেঁদে ফেলতেও দেখা গেছে।

আইনি ও সীমান্ত জটিলতায় ওই ১২ জন জিরো লাইনের ওপারে কাঁটাতারের বাইরে আটকে থাকলেও, তাদের প্রতি মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামের সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দারা বিজিবির নজরদারির মাঝেই কৌশলে শূন্যরেখার কাছাকাছি গিয়ে ওই অসহায় মানুষদের বিস্কুট, পাউরুটি, তরল দুধ, কলা এবং খাওয়ার পানি পৌঁছে দিচ্ছেন। তিন বেলা বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম খাবারের ব্যবস্থা অন্তত স্থানীয়রা করছেন।

উল্লেখ্য, গত গতকাল শুক্রবার (১২ জুন) ভোর পাঁচটার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের ১৪৮/৩-এস সীমান্ত পিলার এলাকা দিয়ে এই ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের (জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া) চেষ্টা চালায় বিএসএফ। তবে বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি জওয়ান এবং সীমান্তবর্তী এলাকার জাগ্রত বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং বাংলাদেশে তাঁদের প্রবেশ সম্পূর্ণ ঠেকিয়ে দেন। শূন্যরেখায় অবস্থান নেওয়া এই দলটিতে ৪ জন পুরুষ, ৪ জন নারী এবং ৪টি শিশু রয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, ওই ব্যক্তিরা যাতে কোনোভাবেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে না পারেন, সে জন্য সীমান্তে টহল ও নজরদারি সর্বোচ্চ জোরদার করা হয়েছে।

বিজিবি সূত্র থেকে জানা গেছে, আজ সকালের পতাকা বৈঠকে বিএসএফের পক্ষ থেকে একপর্যায়ে জানানো হয়েছে যে, এই মানুষেরা আসলে ভারতের নাগরিক কি না—তা তারা ভেতরে ভেতরে যাচাই করে দেখছে। যদি তদন্তে তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণিত হন, তবেই কেবল বিএসএফ তাঁদের ফেরত নেবে। তবে এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে কিংবা পরবর্তী পতাকা বৈঠক আবার কখন অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে বিএসএফ কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিবির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেহেতু এই মানুষদের আমরা পুশ-ইন করিনি এবং এরা আমাদের সীমান্ত থেকে ওপারে যায়নি, সেহেতু তাদের পরিচয় আমাদের যাচাই করার কোনো প্রশ্নই আসে না। অপরাধ বিএসএফ করেছে, সমাধানও তাদের করতে হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *