গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একটি টেকসই সমাধানের চেষ্টা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে পুরো পরিস্থিতি নতুন করে ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে একটি সম্ভাব্য স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘৭টি মূল শর্ত’ ফাঁসের পর পরই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত শুক্রবার (১২ জুন, ২০২৬) নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে (Truth Social) দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ওই প্রকাশিত শর্তগুলোকে সম্পূর্ণ ‘ভুয়া খবর’ (Fake News) বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “মিডিয়াতে ছড়ানো এসব শর্তের সাথে লিখিতভাবে আমরা যেসব শর্তে উভয় পক্ষ সম্মতি দিয়েছি, সেগুলোর কোনোই সম্পর্ক নেই।” ইরানি নীতিনির্ধারকদের কড়া সমালোচনা করে ট্রাম্প আরও যোগ করেন, “এরা চুক্তির ক্ষেত্রে চরম অসৎ। এদের সঙ্গে সৎ উদ্দেশ্যে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা করার সুযোগ নেই।”
অথচ, এর মাত্র একদিন আগে গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজেই গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছিলেন যে, একটি প্রাথমিক চুক্তি ‘অনুমোদন’ হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পেরোতেই ট্রাম্পের এই নতুন বিবৃতি প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যের এই শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এখনো কতটা নড়বড়ে এবং অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ না করলেও, ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ চুক্তির যে ৭টি ‘মূল শর্ত’ প্রকাশ করেছে, তাতেই মূলত মার্কিন প্রশাসন খেপেছে। গত এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধ সাময়িক বন্ধ রাখার একটি চুক্তি হলেও স্থায়ী চুক্তির ক্ষেত্রে ইরান কার্যত কোনো ছাড়ই দেয়নি বলে ইরনার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে:
| ক্রমিক | ইরনা (IRNA) কর্তৃক প্রকাশিত চুক্তির মূল দাবি ও শর্তসমূহ |
|---|---|
| ১ | পরমাণু কর্মসূচি: ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো আপস বা মতৈক্য হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ৬০ দিন পর এ বিষয়ে নতুন আলোচনা শুরু হবে। |
| ২ | হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: হরমুজ প্রণালির কৌশলগত সামরিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার বিষয়ে ইরান একমত হয়নি। প্রাথমিক চুক্তিতে কেবল ওই নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি আছে, যা তেহরান ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে তদারকি করবে। |
| ৩ | ইসরায়েলি হামলা বন্ধ: লেবাননে ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসন, আগ্রাসী নীতি ও হামলা পুরোপুরি বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। |
| ৪ | তহবিল ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের জব্দ করা বিপুল সম্পদের একটি বড় অংশ তাৎক্ষণিক ছাড় দিতে হবে। সম্পদের বাকি অংশ ছাড়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে পরে আলোচনা হবে। |
ইরানি গণমাধ্যমের এমন একতরফা দাবির পর পরই মার্কিন প্রশাসন তাদের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ইরানের কোনো তহবিল বা ফ্রিজড অ্যাকাউন্টসের অর্থ ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে ভ্যান্স সাফ জানিয়ে দেন, “চুক্তির অধীনে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে নির্দিষ্ট শর্তগুলো শতভাগ পূরণ করলেই কেবল এই তহবিল ছাড়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে, তার আগে নয়।” তবে মার্কিন জনগণের উদ্দেশ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবেই হোক আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) জন্য এবং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য একটি ভালো ও লাভজনক ফলাফল নিয়ে আসবেন।”
এদিকে, শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরের এত কাছাকাছি তাঁরা এর আগে কখনোই পৌঁছাননি। তবে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় শর্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোকে অনুমাননির্ভর খবর প্রকাশ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান আরাগচি। অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে, ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে আরাগচির এই এক্স বার্তার একটি স্ক্রিনশটও পোস্ট করে বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন রহস্যের জন্ম দিয়েছেন।
