হজযাত্রীর লাগেজ হারানো নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রণক্ষেত্র: শাহপুর ও আড়াইবাড়ির সংঘর্ষে আহত ৩০, দোকানপাট ভাঙচুর

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় এক ওমরাহ বা হজযাত্রীর লাগেজ হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কসবার কদমতলী এলাকায় দফায় দফায় চলা এই দেশীয় অস্ত্রের লড়াইয়ে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

আজ শনিবার (১৩ জুন, ২০২৬) সকাল ১০টার দিকে কসবা পৌরসভার শাহপুর ও আড়াইবাড়ি গ্রামের লোকজনের মধ্যে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কসবা পৌরসভার শাহপুর গ্রামের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম (৬২) এ বছর পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে একটি হজ কাফেলার মাধ্যমে সৌদি আরবে যান। কিন্তু ফেরার পথে সৌদি আরব বিমানবন্দরে তিনি তাঁর একটি লাগেজ হারিয়ে ফেলেন এবং বাধ্য হয়ে ওই লাগেজ ছাড়াই দেশে ফিরে আসেন।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া লাগেজটি ফিরে পেতে বা এর ক্ষতিপূরণ দাবি করতে মরিয়ম বেগমের পরিবারের সদস্যরা কসবা উপজেলার আড়াইবাড়ি গ্রামের মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের মালিকানাধীন ‘কসবা হজ কাফেলা’ নামক একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে যান। সেখানে এজেন্সি কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দেয় যে, বিমানবন্দরে লাগেজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব হজযাত্রীর নিজস্ব, এজেন্সির নয়।

এই নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত হজযাত্রীর পরিবারের সদস্যরা ওই ট্রাভেল এজেন্সির ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। এ নিয়ে সেদিনই আড়াইবাড়ি ও শাহপুর গ্রামের লোকজনের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়।

গত বৃহস্পতিবারের ওই ঘটনার জের ধরে আজ শনিবার সকাল ১০টার দিকে শাহপুর ও আড়াইবাড়ি—এই দুই গ্রামের শত শত মানুষ লাঠিসোঁটা, ছুরি, দা, বল্লম, রামদাসহ বিভিন্ন মারাত্মক দেশী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কদমতলী মোড়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুই পক্ষের মধ্যে চলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও মুহুর্মুহু ইটপাটকেল নিক্ষেপ। এ সময় কদমতলী মোড়ের বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়। আতঙ্কে বাজারের সমস্ত দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের কসবা অংশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়ে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে কসবা থানার পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে দাঙ্গাবাজদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে একের পর এক কাঁদানে গ্যাসের (টিয়ার শেল) মোড়ক নিক্ষেপ করতে হয়।

দুপুর পর্যন্ত দুই গ্রামের বিভিন্ন গলিতে ও মোড়ে দফায় দফায় এই সংঘর্ষ চলে। অবশেষে দুপুর ১২টার পর এলাকায় তীব্র বৃষ্টি শুরু হলে দাঙ্গাকারীরা মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

পুলিশ ও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই ৩ ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দুই পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল এবং আশঙ্কাজনক কয়েকজনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। এদিকে, ঘটনার পর থেকে কসবা হজ কাফেলার পরিচালক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনীন সুলতানা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “সংঘর্ষের খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দাঙ্গাকারীদের হটাতে পুলিশকে আনুমানিক ২০টি কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই সংঘর্ষ চলে। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে কদমতলী ও দুই গ্রামের প্রবেশমুখে অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *