রাঙ্গামাটিতে বিশ্বকাপ উন্মাদনা: ‘আর্জেন্টিনা সেতুতে’ হাজারো ভক্তের ঢল, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মিষ্টি আতিথেয়তা

বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই এক অন্যরকম আবেগ, আর সেই আবেগের পারদ যদি রাঙ্গামাটির মতো পার্বত্য শহরে পৌঁছায়, তবে তা রূপ নেয় এক পাক্ষিক উৎসবে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সব ধরনের বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে আকাশি-সাদা জার্সি পরে শহরের শহীদ আব্দুর শুক্কুর স্টেডিয়ামে সমবেত হতে থাকেন হাজার হাজার আর্জেন্টিনা সমর্থক। প্রিয় দল আলবিসেলেস্তেদের শুভকামনা জানাতে বর্ণাঢ্য এক মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার আয়োজন করেন তারা, যা পুরো শহরকে উৎসবের নগরীতে পরিণত করে।

মোটরসাইকেল শোভাযাত্রাটিতে সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কানফাটানো ভুভুজেলার শব্দ, ডিজে গানের তালে তালে তরুণদের নৃত্য আর হাতের রঙিন ‘স্মোক ফ্লেয়ার’ (Smoke Flare) পুরো রাঙ্গামাটি শহরকে এক বর্ণিল রূপ দেয়। সমর্থকদের মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিটি রাস্তা।

আর্জেন্টিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল সমর্থকরা কি আর এমন দিনে ঘরে বসে থাকতে পারেন? তবে এবার কোনো ঝগড়া বা অপ্রীতিকর ঘটনা নয়, বরং দেখা গেল এক অনন্য সম্প্রীতির চিত্র। শহরের দোয়েল চত্বরে আর্জেন্টিনার শোভাযাত্রার জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন ব্রাজিল সমর্থকরা।

আর্জেন্টিনা সমর্থক দল সেখানে পৌঁছানো মাত্রই ব্রাজিল ভক্তরা তাদের ক্লান্তি দূর করতে খেজুর খাইয়ে এবং থ্রি-পিস উপহার দিয়ে এক অভিনব কায়দায় অভিবাদন জানান! আর্জেন্টিনার সমর্থকরাও হাসিমুখে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের এই মিষ্টি ও চমৎকার আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।

ব্রাজিল সমর্থক মো. ইব্রাহিম এই প্রসঙ্গে রসিকতা করে বলেন, আমাদের ্যালিতে তারাসেভেন আপদিয়ে বরণ করেছিল, তাই আজ আমরা তাদের ক্লান্তি দূর করতে খেজুর খাওয়ালাম। সাথে থ্রিপিস দিয়ে বরণ করেছি। খেলা মানে আনন্দ, আর আমরা সবাই মিলে সেই আনন্দটাই ভাগাভাগি করছি।

শোভাযাত্রাটি শহর প্রদক্ষিণ শেষে রিজার্ভ বাজার এলাকায় অবস্থিত বিখ্যাত ‘ওয়াই’ (Y) আকৃতির সেতুতে গিয়ে মিলিত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই হাজার হাজার আকাশি-সাদা সমর্থকের উপস্থিতিতে কানায় কানায় ভরে ওঠে পুরো উড়াল সেতুটি। সেখানে বড় বড় পতাকা উড়িয়ে, গান গেয়ে উল্লাস করেন সমর্থকরা। প্রিয় দলের জয়ের হুঙ্কারের পাশাপাশি চিরশত্রু ব্রাজিলকে নিয়ে টিপ্পুনি কাটতেও ছাড়েননি তারা।

  • ম্যারাডোনা ও মেসির ম্যাজিক: প্রবীণ সমর্থক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “১৯৮০ সালের পর যারা খেলা দেখা শুরু করেছে, তারা ম্যারাডোনার জাদু দেখেছে। যার কারণে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক বেশি। ২০২২ সালের পর এবারও ট্রফি মেসির হাতেই উঠবে।”
  • ব্রাজিলকে কটাক্ষ: তরুণ সমর্থক মো. মাহিন খান ও ইয়াছিন রানা সোহেল ব্রাজিলের সমর্থকদের খোঁচা দিয়ে বলেন, “ব্রাজিল শুধু শুধু ফাঁকা বুলি ছাড়ে। ব্রাজিলের অনেক তরুণ সমর্থক তো এখনও তাদের দলকে বিশ্বকাপ নিতেই দেখেনি! আমরা বর্তমান ও বাস্তবে বিশ্বাসী, ট্রফি আমাদের ঘরেই আসবে।”
  • খেজুরের মহিমা: অন্যদিকে মৃনাল তঞ্চগ্যা নামের আরেক সমর্থক রসিকতা করে বলেন, “গত বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে খেজুর খেয়ে শক্তি বাড়িয়ে কাপ নিয়েছিলাম। এবারও ব্রাজিল বন্ধুদের দেওয়া খেজুর আমাদের শক্তি বাড়াবে!”

রাঙ্গামাটি পৌর এলাকার ২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও আর্জেন্টিনা সমর্থক মো. হেলাল উদ্দিন এই উৎসবের মূল বার্তাটি দিয়ে বলেন, “আমরা ফুটবলকে ভালোবাসি। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো—একদিন আমাদের বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে। সেদিন দেশের জন্য এর চেয়েও ১০০ গুণ বড় শোভাযাত্রা করব। যতদিন বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে না যাচ্ছে, ততদিন আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিয়ে যাব। সব দলের সমর্থকদের প্রতি আহ্বান—আসুন ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *