চাকরির টোপ দিয়ে চীনা গুপ্তচরবৃত্তি: ‘ফাইভ আইজ’ গোয়েন্দা জোটের নজিরবিহীন যৌথ সতর্কবার্তা

চাকরির লোভনীয় প্রস্তাবের আড়ালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে চীনা গুপ্তচররা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের শক্তিশালী গোয়েন্দা জোট ফাইভ আইজ’ (Five Eyes) যৌথভাবে এই ভয়ঙ্কর তথ্য ফাঁস করে বিশ্বজুড়ে হাই-অ্যালার্ট বা বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে।

গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন, ২০২৬) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রকাশ পায়।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত বুধবার (৩ জুন, ২০২৬) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (FBI), যুক্তরাজ্যের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স সেকশন ফাইভ (MI5), কানাডার সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (CSIS), অস্ট্রেলিয়ার সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (ASIO) এবং নিউজিল্যান্ডের সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (NZSIS) যৌথভাবে একটি বিশদ বৈশ্বিক সতর্কবার্তা প্রকাশ করে। তাদের দেওয়া যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনা সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ ভুয়া ও ছদ্মনাম ব্যবহার করে ইন্টারনেট দুনিয়ায় জাল বিছিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চীনা হ্যাকার ও গুপ্তচররা নিজেদের স্বনামধন্য বহুজাতিক কোম্পানির মানবসম্পদ (HR) কর্মকর্তা বা পেশাদার নিয়োগদাতা (Recruiter) হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। তারা মূলত ৩টি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মকে টার্গেট করেছে: ১. লিংকডইন (LinkedIn) ২. ইনডিড (Indeed) ৩. আপওয়ার্ক (Upwork)

এসব প্ল্যাটফর্মে তারা এমনভাবে চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়, যা দেখতে সাধারণ ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হয়। কিন্তু পর্দার আড়ালে এর মূল উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলা।

চীনা গোয়েন্দাদের মূল টার্গেটে রয়েছেন:

  • সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা ছাড়পত্রধারী (Security Clearance) ব্যক্তিবর্গ।
  • প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ, সামরিক কর্মকর্তা ও কৌশলগত গবেষক।
  • সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি নিয়ে কাজ করা ফ্রিল্যান্স কনসালটেন্ট ও লেখক।

প্রথম ধাপ (যোগাযোগ): প্রথমে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে অত্যন্ত পেশাদারভাবে যোগাযোগ করা হয় এবং অনলাইনে প্রাথমিক ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। ইন্টারভিউয়ের মাঝেই চতুরতার সাথে প্রার্থীর সরকারি সংযোগ বা সামরিক কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপ (টাস্ক বা পরীক্ষা): প্রার্থীদের যোগ্যতা পরীক্ষার নামে চীন-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, তাইওয়ান সংকট কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন বা অ্যানালিসিস লিখতে দেওয়া হয়।

তৃতীয় ধাপ (গোপন অ্যাপ ও ক্রিপ্টো পেমেন্ট): এক পর্যায়ে প্রার্থীর বিশ্বাস অর্জন করে তাদের আরও সংবেদনশীল ও অপ্রকাশিত সরকারি তথ্য দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখতে সাধারণ ইমেইল ছেড়ে ‘এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে’ (যেমন সিগন্যাল বা টেলিগ্রাম) যোগাযোগ স্থানান্তর করা হয়। বিনিময়ে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ পাঠানো হয় পেপ্যাল (PayPal), ওয়াইজ (Wise), জেল (Zelle) কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির (Cryptocurrency) মাধ্যমে।

 

বিশ্বের শীর্ষ গোয়েন্দা প্রধানরা সতর্ক করে বলেছেন, অজান্তে বা অর্থের লোভে এই ধরণের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে চাকরি হারানো, নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল হওয়া সহ কঠোর রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ সাধারণ বা অশ্রেণিবদ্ধ (Unclassified) তথ্যও অনেক সময় বিগ ডাটা অ্যানালিসিসের মাধ্যমে বড় ধরণের রাষ্ট্রীয় ক্ষতি করতে পারে। ফাইভ আইজ জোট অপরিচিত নিয়োগদাতা ও অতি লোভনীয় বা সন্দেহজনক চাকরির প্রস্তাবের লিংকে ক্লিক করা থেকে সবাইকে কঠোরভাবে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *