ফেনীতে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে মহাসড়কে ত্রিমুখী বিপর্যয়: ধাক্কা দিয়ে পুকুরে উল্টে গেল কাভার্ডভ্যান ও পিকআপভ্যান, চালক নিহত

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে ঘটে গেছে এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। মহাসড়কে দ্রুতগামী একটি কাভার্ডভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা একটি পিকআপভ্যানকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, দুটি গাড়িই একসঙ্গে মহাসড়কের পাশে থাকা একটি গভীর পুকুরে ছিটকে পড়ে উল্টে যায়। এই লোহমর্ষক দুর্ঘটনায় পিকআপভ্যানের চালক মো. কাউছার (৪০) গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

রোববার (৭ জুন, ২০২৬) দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের সবুজবাগ এলাকায় এই শোচনীয় ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। দুর্ঘটনার পর মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে কিছু সময়ের জন্য যানবাহন চলাচল ব্যাহত হলেও হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, রোববার দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফাজিলপুরের সবুজবাগ এলাকা দিয়ে একটি পিকআপভ্যান ঢাকার অভিমুখে যাচ্ছিল। এই সময় পিকআপভ্যানটির ঠিক পেছনে থাকা একটি দ্রুতগতির কাভার্ডভ্যান হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সামনে থাকা পিকআপভ্যানটির পেছনে অত্যন্ত সজোরে ধাক্কা মারে।

সড়কের ওপর কাভার্ডভ্যানের এই প্রচণ্ড ধাক্কা সামলাতে পারেনি পিকআপভ্যানটি। মুহূর্তের মধ্যে দুটি গাড়িই মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক ঘেঁষে থাকা একটি পুকুরের পানিতে গিয়ে পড়ে এবং উল্টে যায়। গাড়ি দুটি পুকুরের পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে পড়লে ভেতরে থাকা চালক ও সহকারীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

দুর্ঘটনাটি ঘটার পরপরই আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা এবং মহাসড়কে চলাচলকারী অন্যান্য যানবাহনের চালকেরা দ্রুত উদ্ধার কাজে হাত বাড়ান। তাঁরা পুকুরের পানিতে নেমে পড়েন এবং দীর্ঘ চেষ্টার পর উল্টে যাওয়া পিকআপভ্যানের ভেতর থেকে এর চালক মো. কাউছারকে অত্যন্ত গুরুতর ও রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন।

স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে মুমূর্ষু কাউছারকে উদ্ধার করে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পানির নিচে অবরুদ্ধ থাকার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা।

নিহত পিকআপভ্যান চালক মো. কাউছার কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার অন্তর্গত বাঙ্গরা থানার দৌলতপুর ইউনিয়নের মো. জয়নাল আবেদীনের সন্তান। তাঁর এই অকাল মৃত্যুর খবর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে চরম শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ফাজিলপুর হাইওয়ে থানা পুলিশের একটি দল রেকারসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ স্থানীয়দের সহায়তায় পুকুরে তলিয়ে যাওয়া কাভার্ডভ্যান ও পিকআপভ্যানটি রেকার দিয়ে টেনে ওপরে তোলে এবং হাইওয়ে থানা হেফাজতে নিয়ে যায়।

এই বিষয়ে ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদ খান চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, “সবুজবাগ এলাকায় ঢাকামুখী একটি পিকআপভ্যানের পেছনে একটি কাভার্ডভ্যান সজোরে ধাক্কা দিলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে এবং দুটি গাড়িই পুকুরে পড়ে যায়। আমরা দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি রেকার দিয়ে নদী বা পুকুর থেকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে এসেছি।”

ওসি আরও যোগ করেন, নিহত পিকআপভ্যান চালক কাউছারের মরদেহ বর্তমানে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের আইনি প্রক্রিয়া এবং ময়নাতদন্তের কাজ সম্পন্ন করার পর লাশটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পরিবারের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এই সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কাভার্ডভ্যান চালকের কোনো গাফিলতি বা যান্ত্রিক ক্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ ঘটনায় একটি সড়ক পরিবহন আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চিকিৎসাধীন ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে মাঝেমধ্যেই এমন নিয়ন্ত্রণ হারানোর দুর্ঘটনা ঘটছে, যা চালক ও যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ফাজিলপুর ও এর আশপাশের এলাকায় মহাসড়কের পাশে উন্মুক্ত পুকুর বা ডোবা থাকায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালেই তা সরাসরি পানিতে গিয়ে পড়ছে, যা প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও পুকুর ঘেঁষে থাকা অংশগুলোতে অনতিবিলম্বে শক্তিশালী গার্ডরেইল বা সুরক্ষাপ্রাচীর নির্মাণ করা উচিত, যেন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালেও সরাসরি পুকুরে ছিটকে না পড়ে। একই সাথে মহাসড়কে কাভার্ডভ্যান ও ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত স্পিডগান নজরদারি আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *