চলমান ইরান যুদ্ধে নিয়োজিত মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) সৈন্যকে এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহার করার কোনো ধরনের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরান ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনীর চলমান এই বিশেষ সামরিক অভিযানের একটি যৌক্তিক ও চূড়ান্ত সমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত মার্কিন সেনারা মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধাঞ্চলে অবস্থান করবে।
গত শুক্রবার (৫ জুন, ২০২৬) রেকর্ড করা এবং রোববার (৭ জুন) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এনবিসি-র বিখ্যাত ‘মিট দ্য প্রেস’ (Meet the Press) অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত এক বিস্তৃত ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর সামরিক অবস্থানের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল যুদ্ধপরিস্থিতিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনার জীবন বড় ধরনের কোনো ঝুঁকির বা বিপদের মুখে রয়েছে কি না। এমন প্রশ্নের জবাবে চিরাচরিত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ট্রাম্প বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে আমাদের বীর সেনারা সেখানে কোনো বিপদের মধ্যে রয়েছে। আমাদের বর্তমান আকাশ, স্থল ও নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমেরিকার এ যাবৎকালের ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা ও আধুনিক। শুধু রক্ষণভাগই নয়, আমাদের সামরিক আক্রমণের ধার বা আক্রমণভাগও এ যাবৎকালের সেরা। তাই আমি চলমান এই পরিস্থিতিকে মার্কিন বাহিনীর জন্য কোনো বড় বিপদ বলে মনে করি না।”
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তড়িঘড়ি করে সেনা প্রত্যাহারের ধারণাকে নাকচ করে দিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, “এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়াটা চরম বোকামি ছাড়া আর কিছুই হবে না। কারণ, সামনের দিনগুলোতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিংবা ইরানের কৌশলগত অবস্থান ধ্বংস করতে সেখানে অবস্থানরত সেনাদের যেকোনো সময় বড় আকারে ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে।”
সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান অভিযানে মার্কিন বাহিনীর হতাহতের সংখ্যাকে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে তুলনা করেন, যে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতে ৫৮,০০০-এরও বেশি বীর সৈন্য হারিয়েছিল। সেই তুলনায় ইরানে মার্কিন সৈন্য মৃত্যুর হারকে অত্যন্ত কম ও অবিশ্বাস্য বলে দাবি করেন তিনি।
এই বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা এই চলমান ইরান সংঘাত ও যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনাকে হারিয়েছি। আমি স্বীকার করি, তেরো জন মানুষের জীবন অনেক বড় বিষয়, তেরো সংখ্যাটি অনেক বেশি। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমাদের একজন সেনাকেও হারাতে চাই না। কিন্তু আপনি যদি অতীতের ভিয়েতনাম যুদ্ধের দিকে তাকান, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিল, কিংবা যদি আপনি বিগত দিনের গত সাত-আটটি যুদ্ধের যেকোনো একটির দিকে তাকান যেখানে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, সেই তুলনায় আমরা হারিয়েছি মাত্র ১৩ জন। আমি আবারও বলছি, ১৩ জনও অনেক বেশি, তবে এই ১৩ সংখ্যাটি তার চেয়ে অনেক কম, যা এই যুদ্ধ শুরুর আগে কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।” সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তিনি গর্বের সাথে যোগ করেন, “আমার মনে হয় আমরা ইরান যুদ্ধে সার্বিকভাবে খুব ভালো করছি এবং যুদ্ধক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই রয়েছে।”
উল্লেখ্য, গত ২ মার্চ ইরানের সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত অবস্থানগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) নামে এক প্রলয়ংকরী হামলা শুরু করে। এই হামলার সমর্থনে মার্কিন নৌবাহিনীর পরাক্রমশালী বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ (USS Abraham Lincoln)-এর ফ্লাইট ডেকে যুদ্ধবিমানগুলোর দিনরাত ওঠানামা ও অবতরণের প্রস্তুতি মার্কিন সামরিক তৎপরতার অগ্রগতির সাক্ষ্য দিচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে এ পর্যন্ত মোট ১৩ জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। যার বিবরণ অত্যন্ত স্পর্শকাতর:
- গত ১ মার্চ কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ শুয়াইবা বন্দরে ইরানের আকস্মিক ও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রথম দফায় ছয়জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হন।
- এরপর গত ৮ মার্চ সৌদি আরবের বিখ্যাত প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের আরেকটি পাল্টা হামলায় আরও একজন মার্কিন সেনা সদস্য মারা যান।
- সর্বশেষ, গত ১২ মার্চ পশ্চিম ইরাকের আকাশে মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি ‘কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার’ (KC-135 Stratotanker) আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান আকস্মিকভাবে বিধ্বস্ত হলে সেটির ভেতরে থাকা ছয়জন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হন।
সৈন্যদের এই মৃত্যুর পরও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখার নীতিতেই অনড় রয়েছেন। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, ইরানকে পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র গতি কমানো হবে না। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে।
