সুন্দরবনের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক নৌ-প্রোটোকল রুটে চলাচলকারী ‘এমভি আব্দুল হাকিম-১’ নামে একটি কার্গো জাহাজে লাইফ জ্যাকেট পরিহিত একদল সশস্ত্র বনদস্যু অতর্কিত হামলা, গুলি ও লুটপাট চালিয়েছে। ডাকাত দলটির সদস্যরা জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করে স্টাফদের মারধর করার পাশাপাশি মাস্টার কেবিন লক্ষ্য করে অন্তত ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। এই জাহাজে সফলভাবে ডাকাতি সম্পন্ন করার পাশাপাশি একই বহরে থাকা আরও চারটি ভারতগামী পণ্যবাহী কার্গো জাহাজেও ডাকাতির চেষ্টা চালায় সশস্ত্র দস্যুরা।
গত শনিবার (৭ জুন, ২০২৬) রাতে বাগেরহাটের সুন্দরবনের শিবসা নদী পার হয়ে শিংয়েরনালা নামক দুর্গম স্থানে এই ভয়ংকর ডাকাতির ঘটনা ঘটে। তবে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই লোমহর্ষক ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও স্থানীয় থানা পুলিশ কিংবা কোস্টগার্ডের মতো কোনো নিরাপত্তা বাহিনীই বিষয়টি সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। ঘটনার এত দীর্ঘ সময় পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন নীরবতা ও তথ্যহীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ-রুটের শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নৌপথ সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারত-বাংলাদেশ নৌ-প্রোটোকলের অধীনে নিয়মিতভাবে ঢাকা থেকে মোংলা বন্দর হয়ে সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া, বজবজা, আড়ুয়া শিবসা এবং শিবসা নদী দিয়ে ভারতে নৌযানগুলো যাতায়াত করে। ঘটনার দিন মোংলা থেকে ভারতের উদ্দেশে একযোগে রওয়ানা হওয়া পাঁচটি জাহাজের বহরে ছিল—এমভি খারেহেরা, এমভি বয়রাতলা, এমভি আ. হাকিম, এমভি আরিয়ান ছালাম এবং আক্রান্ত হওয়া এমভি আব্দুল হাকিম-১।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রোটোকল কমিটির কার্যকরী সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বলেন, “আক্রান্ত ও ধাওয়ার শিকার হওয়া এই কার্গো জাহাজগুলো সম্পূর্ণ খালি ছিল। এগুলো মূলত ভারত থেকে ফ্লাইঅ্যাশ (যা সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল) আনার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের মোংলা থেকে যাত্রা করেছিল। শনিবার দুপুর ২টার দিকে জাহাজগুলো মোংলা বন্দর ছেড়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু শেখবাড়িয়া পয়েন্ট থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার দূরত্বে থাকা অবস্থায়ই নদীপথে ওত পেতে থাকা ডাকাত দল জাহাজগুলোর ওপর আকস্মিক হানা দেয়।”
নৌ-প্রোটোকল কমিটির কার্যকরী সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম আরও জানান, কার্গো জাহাজের বহরটি যখন শিবসা নদী পাড়ি দিয়ে শিংয়েরনালা খালের ভেতরে প্রবেশ করে, ঠিক তখনই একটি ট্রলারে চড়ে আসা ডাকাত দল জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে তীব্র ধাওয়া শুরু করে। গতি বেশি থাকায় সামনে থাকা চারটি জাহাজ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ডাকাতদের কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সমর্থ হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত, বহরের সবার পেছনে থাকা ‘এমভি আব্দুল হাকিম-১’ জাহাজটি ডাকাতদের নাগালের মধ্যে পড়ে যায় এবং দস্যুরা সেটির ওপর চড়াও হয়। জাহাজে উঠেই ডাকাতরা সামনে থাকা সাধারণ স্টাফদের বেধড়ক মারধর ও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা শুরু করে।
আক্রান্ত এমভি আব্দুল হাকিম-১ জাহাজের ইনচার্জ মাস্টার মো. নুর নবীর বরাত দিয়ে সিরাজুল ইসলাম ঘটনার বিবরণীতে আরও বলেন, শনিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে এই নারকীয় ঘটনাটি ঘটে। একটি ট্রলারে চড়ে আসা ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সুসংগঠিত ডাকাত দল, যাদের সবার গায়ে লাইফ জ্যাকেট পরা ছিল, তারা কার্গো জাহাজের বাম পাশ দিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ওপরে উঠে পড়ে। তারা ডেকের নিচে থাকা স্টাফদের অস্ত্রের মুখে বেঁধে ফেলে এবং নির্মমভাবে মারধর করতে থাকে।
নিচে ডাকাত পড়ার বিষয়টি টের পেয়ে জাহাজের ইনচার্জ মাস্টার তাৎক্ষণিকভাবে ওপরের মাস্টার ব্রিজের সবকটি লোহার গেইট ও দরজা ভেতর থেকে শক্তভাবে আটকে দেন। ডাকাত দল মাস্টার কেবিনে ঢোকার জন্য দরজায় লাথি মারে এবং ভেতরে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর তারা মাস্টার কেবিনের বন্ধ দরজার ওপর লক্ষ্য করে শটগান দিয়ে টানা ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। পুরো এলাকায় তখন এক চরম আতঙ্ক ও যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ডাকাত দল প্রায় ১৫ মিনিট ধরে জাহাজের ওপর নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং স্টাফদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করে স্পিডবোট বা ট্রলার যোগে সুন্দরবনের গহিন খালের ভেতরে চম্পট দেয়।
সুন্দরবনের ভেতরের এই আন্তর্জাতিক নৌপথে এমন দুর্ধর্ষ ডাকাতি এবং গুলির ঘটনার পর তীব্র নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন সাধারণ নৌযান শ্রমিকেরা। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে নৌযান শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সমাজকল্যাণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের মোংলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
তিনি বলেন, “সুন্দরবনের মতো জায়গায় আন্তর্জাতিক প্রোটোকল রুটে যদি এমন সশস্ত্র হামলার ঘটনা প্রতিনিয়ত অব্যাহত থাকে, তবে কোনোভাবেই বাংলাদেশ-ভারত রুটে জাহাজ চলাচল সচল রাখা সম্ভব হবে না। আমরা সরকারের কাছে আমাদের নৌযান শ্রমিকদের জীবনের শতভাগ নিরাপত্তা দাবি করছি। এমন চরম জীবনহানির ঝুঁকি নিয়ে আমাদের শ্রমিকেরা এই পথে আর কোনো জাহাজ চালাতে রাজি নয়।”
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী আরও স্পষ্ট করে বলেন, “নদী ও সাগরে আমাদের জাহাজগুলো জোয়ার-ভাটার হিসাব করে চলাচল করতে বাধ্য হয়। এর ফলে অনেক সময় সকাল কিংবা গভীর সন্ধ্যাও হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের মূল দাবি হলো, যেকোনো পরিস্থিতিতে নদীতে কোস্টগার্ড বা নৌ-পুলিশের মাধ্যমে আমাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভারত-বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পথে আমরা সমস্ত জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবো।”
সুন্দরবনের ভেতরের আন্তর্জাতিক নৌপথে এত বড় ধরনের একটি সশস্ত্র হামলা এবং গুলির ঘটনা ঘটে গেলেও মোংলা কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে অফিশিয়ালি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পর মোংলা তিন থানার পুলিশও বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেনি।
এই বিষয়ে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমি লোকমুখে ও বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী বা জাহাজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।” অন্যদিকে সুন্দরবনের এই অঞ্চলের সাথে সম্পৃক্ত খুলনার দাকোপ ও কয়রা থানা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তারাও এই ডাকাতি ও গুলির বিষয়ে তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে দাবি করেছে, যা পুরো অঞ্চলের নৌ-নিরাপত্তার দুর্বলতাকে আবারও নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিল।
