দেশে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক হিসাবের তথ্য, পিন, পাসওয়ার্ড কিংবা ওটিপি (ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড) কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পাশাপাশি সন্দেহজনক লিংক, ভুয়া অ্যাপ এবং প্রতারণামূলক আর্থিক অফার থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সোমবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্স কোম্পানি প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (এফসিআরপিডি) এ-সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিজ্ঞপ্তিটি দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা, আর্থিক সেবার মান উন্নয়ন এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তাদের হটলাইন নম্বর ১৬২৩৬ চালু রয়েছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাসংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ, তথ্য কিংবা পরামর্শের জন্য গ্রাহকরা এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।
গ্রাহকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
নতুন নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের উদ্দেশে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ব্যাংক হিসাব নম্বর, এটিএম বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন, পাসওয়ার্ড ও ওটিপি কখনোই অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করা।
- অজানা বা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা এবং অপরিচিত উৎস থেকে কোনো অ্যাপ ডাউনলোড বা ইনস্টল না করা।
- অনলাইন জুয়া, প্রতারণামূলক বিনিয়োগ কিংবা অবৈধ আর্থিক লেনদেন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে জামানতবিহীন ঋণ, বিনিয়োগ বা আর্থিক সুবিধার প্রলোভন দিলে তা বিশ্বাস না করা।
- লটারি, পুরস্কার বা আকর্ষণীয় অফারের নামে অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হলে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়া।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও নির্দেশনা
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধে শুধু গ্রাহক সচেতন হলেই হবে না, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য দেশের সব ফাইন্যান্স কোম্পানিকে নিয়মিতভাবে তাদের গ্রাহকদের সচেতন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এসএমএস, ই-মেইল, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে গ্রাহকদের সতর্ক করতে হবে। পাশাপাশি প্রতারণার ঝুঁকি সম্পর্কে সময়মতো তথ্য দিয়ে নিরাপদ আর্থিক লেনদেনে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে।
প্রতারণার আশঙ্কা দেখা দিলে কী করবেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেউ যদি আর্থিক প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা করেন বা সন্দেহজনক কোনো কার্যক্রমের মুখোমুখি হন, তাহলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানাতে হবে, যাতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
আইনের আওতায় জারি করা হয়েছে নির্দেশনা
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ধারা ৪১(২)(ঘ)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো আর্থিক খাতে গ্রাহকদের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ক্রমবর্ধমান সাইবার ও অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের ফিশিং, ভুয়া কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, ভুয়া ঋণ ও বিনিয়োগের প্রলোভনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এই সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন।
