মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সংঘাত নিরসনে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ সচল রাখার লক্ষ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসার সম্ভাবনা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা ও গভীর মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার দোহায় ইরানের সাথে একটি নতুন উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভার কথা জানালেও, তেহরান এই বৈঠকের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এই তীব্র মতবিরোধের জেরে গত ১৭ জুনের ঐতিহাসিক সংঘাত স্থগিতকরণ চুক্তির মারাত্মক ভঙ্গুরতা উন্মোচিত হয়েছে, যা আগামী নভেম্বরের মার্কিন কংগ্রেসীয় নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আলোচনা এগিয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদল কাতারে পাঠানো হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং প্রভাবশালী বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে মার্কিন আলোচক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দোহায় পাঠাচ্ছেন। জ্যারেড কুশনারের মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে পূর্বের বিশেষ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তেহরানের সাথে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তেহরানের অনমনীয় অবস্থান ও বৈঠকের অস্বীকৃতি
যদিও এই সপ্তাহে ইরান তাদের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি প্রতিনিধিদল কাতারের রাজধানী দোহায় পাঠাচ্ছে, তবে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই সফরের সাথে মার্কিনদের আগমনের কোনো সম্পর্ক নেই। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের प्रवक्ता (মুখপাত্র) ইসমাইল বাঘাই তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছেন, মার্কিন प्रतिनिधियों দোহা সফরের সঙ্গে ইরানের কারিগরি দলের বৈঠকের কোনো সম্পর্ক নেই এবং দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার কোনো সময়সূচি বা এজেন্ডা নির্ধারিত হয়নি। বাঘাই অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, “আগামী দিনগুলোতে আমরা মার্কিন পক্ষের সঙ্গে কোনো পর্যায়েই কোনো ধরনের আলোচনা সভা করব না।” ইরানের এই অনমনীয় অবস্থান ট্রাম্পের একতরফা শান্তিদূত পাঠানোর কূটনৈতিক উদ্যোগকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
১৭ জুনের চুক্তির ভঙ্গুরতা ও ১৪-দফা সমঝোতা স্মারক
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দোহায় আদৌ কোনো বৈঠক হবে কিনা—এই সুনির্দিষ্ট মতবিরোধটি মূলত গত ১৭ জুনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির চরম ভঙ্গুরতা ও অস্থিতিশীলতাকেই বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। উল্লেখ্য, এই চুক্তিটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সাময়িকভাবে স্থগিত করার জন্য করা হয়েছিল, যা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমূজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যাহত করেছে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পূর্বে স্বাক্ষরিত এপ্রিলের সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনার উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকটি (MoU) পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য নিজেদেরকে অন্তত ৬০ দিন সময় দিয়েছিল। কিন্তু কূটনৈতিক স্তরে এই অগ্রগতির চাকা অত্যন্ত ধীর গতিতে এবং থেমে থেমে চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছে যে, উভয় পক্ষই একে অপরকে চুক্তির মূল শর্তাবলী ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য অনবরত অভিযুক্ত করছে।
হরমূজ প্রণালীর স্থবিরতা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
এই সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের ওপর আকস্মিক বিমান হামলা চালায়। এই হামলার পর চরম ক্ষুব্ধ ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমূজ প্রণালীর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় এর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক সামুদ্রিক যান ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।
ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সংবেদনশীল এই জলপথটি দিয়ে পূর্বে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) চলাচল করত। হরমূজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে, যার পরোক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ, রুপা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কমোডিটির মূল্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।
ইসরায়েলের দূরত্ব এবং লেবাননে শান্তির প্রচেষ্টা জটিল
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি ইসরায়েল এই মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা বা সমঝোতা প্রক্রিয়াকে মোটেও ইতিবাচকভাবে নেয়নি। তারা এই চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই চলমান তীব্র উত্তেজনা ও দ্বিমুখী অবস্থান লেবাননে চলমান যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকেও মারাত্মকভাবে জটিল ও বাধাগ্রস্ত করে তুলেছে।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ যোদ্ধা হিজবুল্লাহর প্রধান রাজনৈতিক মিত্র এবং দেশটির সংসদ স্পিকার নাবিহ বেরি এই সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে গভীর সংশয় ও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, মার্কিন প্রশাসনের একতরফা নীতি এবং ইরানের সঙ্গে বাড়তে থাকা অবিশ্বাসের কারণে লেবানন সীমান্তে স্থায়ী শান্তি আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে দোহার সম্ভাব্য বৈঠককে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক চরম অচলাবস্থা বিরাজ করছে, যার ওপর পুরো বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
