বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনতে শক্তিশালী পুঁজিবাজারের ওপর জোর গভর্নরের

দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সম্প্রসারণে একটি শক্তিশালী, গভীর ও গতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি আরও জোরদার হবে।

সোমবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) পিএলসি-এর একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠককালে গভর্নর এসব কথা বলেন। সিএসই চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি গভর্নরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।

বৈঠকে গভর্নর বলেন, দেশের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি পর্যায়ক্রমে ১০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনে কেবল ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন যথেষ্ট নয়; বরং একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার বিকল্প অর্থায়নের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজার সম্প্রসারিত হলে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি ইকুইটি অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এতে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান অর্থায়নের চাহিদা পূরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্যও আরও বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

গভর্নর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরে বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পুঁজিবাজারের বাজার মূলধন অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে দেশের পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে। পরবর্তী বছরগুলোতেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে পুঁজিবাজার বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হবে।

তার মতে, একটি গতিশীল পুঁজিবাজার দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি অর্থনীতির বহুমুখীকরণেও এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বৈঠকে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন গভর্নর। তিনি জানান, ২০২৬ সালের ২০ মে জারি করা এফইআইডি সার্কুলার নং-০২ এর মাধ্যমে ‘নন-রেসিডেন্ট ইনভেস্টরস’ টাকা অ্যাকাউন্ট (নিটা) পরিচালনার বিধিমালায় সংশোধন আনা হয়েছে।

সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট নিটা হিসাবে জমা হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো প্রযোজ্য মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গভর্নর বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে নীতিগত সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে, সিএসই প্রতিনিধিদল দেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এবং বাজার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ে গভর্নরের সঙ্গে মতবিনিময় করে। তারা পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে এবং নতুন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা কামনা করেন।

সিএসই প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. সাইফুর রহমান মজুমদার, মহাব্যবস্থাপক মোর্তূজা আলম এবং মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মনিরুল হক। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাত দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে আরও বেশি সক্ষম হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের চাপ কমে আর্থিক খাতে ভারসাম্য তৈরি হবে। ফলে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে পুঁজিবাজার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *