মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো পাঁচ বাংলাদেশি প্রবাসীর মরদেহ অবশেষে নিজ জন্মভূমি সিলেটে এসে পৌঁছেছে। আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল পৌনে ৭টায় জাতীয় পতাবাহী বিমান বাংলাদেশের একটি বিশেষ ফ্লাইটে মরদেহগুলো সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে কফিনগুলো এসে পৌঁছানোর পর সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বিমানবন্দর সংলগ্ন পুরো এলাকা।
বিমানবন্দরে নিহতদের কফিন গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় দাফতরিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর ওয়েজ অনার্স কল্যাণ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহগুলো তাদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। নিহত এই পাঁচ রেমিট্যান্স যোদ্ধার বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়। জীবিকার তাগিদে মরুভূমির দেশে পাড়ি জমানো এই যুবকদের এমন অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো কানাইঘাট উপজেলাজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
বিমানবন্দরে স্বজন ও জনপ্রতিনিধিদের ঢল
মঙ্গলবার ভোরে কুয়াশা আর মেঘলা আকাশ ভেদ করে যখন মরদেহবাহী বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করে, তখন থেকেই বিমানবন্দরের বাইরে জড়ো হতে থাকেন শত শত মানুষ। নিহতদের পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের পাশাপাশি বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিশিষ্ট সমাজসেবক এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
কানাইঘাট এলাকার মানুষের এই চরম বিপদে ও শোকের মুহূর্তে সান্ত্বনা দিতে বিমানবন্দরে সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন সিলেট-৫ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মুফতি মাওলানা আবুল হাসান। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সাথে তিনি প্রবাসীদের কল্যাণে সরকার সব সময় পাশে থাকবে বলে পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করেন।
ওয়েজ অনার্স কল্যাণ বোর্ডের তাৎক্ষণিক আর্থিক অনুদান
মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বিমানবন্দরে কফিনগুলো হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদারকি করেছে সরকারের ওয়েজ অনার্স কল্যাণ বোর্ড। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত ওয়েজ অনার্স কল্যাণ বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, নিহত প্রবাসীদের পরিবারগুলোর আকস্মিক এই অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বোর্ডের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
প্রাথমিক দাফন-কাফন ও জরুরি খরচের জন্য নিহত প্রত্যেক প্রবাসীর পরিবারকে নগদ ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা আরও আশ্বাস দেন যে, এটি কেবল প্রাথমিক সহায়তা; পরবর্তীতে বোর্ডের নিয়মানুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাই শেষে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে আরও ৩ লাখ টাকা করে স্থায়ী অনুদান বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে।
কানাইঘাটে সম্মিলিত জানাজা ও পারিবারিক কবরস্থানে দাফন
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দর থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহগুলো কানাইঘাটে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আজ মঙ্গলবার যোহরের নামাজের পর কানাইঘাট উপজেলার দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী আকুনি মাদরাসা মাঠে নিহত পাঁচ প্রবাসীর এক বিশাল সম্মিলিত জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় উপজেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ, আলেম-উলামা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা শুভাকাঙ্ক্ষীরা অংশ নেবেন। জানাজার নামাজ শেষ হওয়ার পর মরদেহগুলো তাদের নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে এবং রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন কার্য সম্পন্ন করা হবে।
কাতার দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, জীবিকার তাগিদে ও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে এই পাঁচ বাংলাদেশি যুবক কাতারে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু গত ২১ জুন (রবিবার) কাতারের একটি মহাসড়কে তারা এক ভয়াবহ ও নির্মম সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। দ্রুতগামী একটি গাড়ির সাথে তাদের বহনকারী যানবাহনের সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই কানাইঘাটের এই পাঁচ কৃতি সন্তান প্রাণ হারান। কাতার প্রশাসনের আইনি প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ৯ দিন পর আজ তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলো। রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখা এই পাঁচ প্রবাসীর এমন মর্মান্তিক চলে যাওয়া দেশের অর্থনীতি এবং তাদের পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
