ঐতিহাসিক জুলাই গণ-আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত ছয়জনকে নৃশংসভাবে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আজ রায় ঘোষণা করা হবে。 আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই হাইভোল্টেজ মামলার রায় ঘোষণা করবেন。 জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত ট্রাইব্যুনালে এটি অন্যতম একটি বহুল আলোচিত ও সংবেদনশীল মামলা, যার দিকে দেশবাসী ও রাজনৈতিক মহলের গভীর নজর রয়েছে।
মামলার বিবরণী ও প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র গণ-আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় মহাজোটের ক্যাডাররা নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে ৬ জন নিরীহ ছাত্র ও সাধারণ মানুষ নিহত হন。 এই হত্যাকাণ্ডে উসকানি, পরিকল্পনা এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে সরাসরি সহযোগিতা করার অভিযোগে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলাটি দায়ের করা হয়।
হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ৮টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মোট ৮টি সুনির্দিষ্ট গুরুতর অভিযোগ আদালতে উত্থাপন করা হয়েছে。 অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, জুলাই আন্দোলন চলাকালে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপন ও নীতিনির্ধারণী বৈঠক করে দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করার পরিকল্পনা প্রণয়ন, হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা এবং উসকানি দেওয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনে প্ররোচিত করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও আইনি সময়রেখা
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রজনতাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু হয়। সুদীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা আদালতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানি শেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় দীর্ঘ শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া চলাকালে শহীদ পরিবারের সদস্য, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ (আইও) মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। গত ১৩ মে (২০২৬) উভয় পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব, জেরা ও যুক্তিখণ্ডন শেষে এই মামলার সব ধরনের বিচারিক কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল, যার চূড়ান্ত অবসান ঘটছে আজ মঙ্গলবার দুপুরে।
সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি প্রসিকিউশনের, খালাস চান আসামিপক্ষ
মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্বে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা (প্রসিকিউশন) আদালতে দাবি করেন, তারা হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আনা সবকটি অভিযোগ এবং কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যার ঘটনায় তার প্রত্যক্ষ উসকানি ও সহযোগিতার বিষয়টি তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্যের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। জুলাই আন্দোলনে শহীদদের রক্তের প্রতি সুবিচার এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
অপরদিকে, হাসানুল হক ইনুর পক্ষের আইনজীবীরা আদালতের কাছে তাদের মক্কেলের সম্পূর্ণ নির্দোষিতা দাবি করেছেন এবং আনীত সব অভিযোগ থেকে তার খালাস চেয়েছেন। আসামিপক্ষের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইনুকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট বা প্রত্যক্ষ ভিত্তি প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি। এই যুক্তিতে আসামির আইনজীবীরা আদালতের কাছে ইনুর সম্পূর্ণ খালাস বা অব্যাহতি প্রার্থনা করেছেন।
রায় ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার
আজ দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট ও ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে。 আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে যেন যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো যায়। কুষ্টিয়ার শহীদ পরিবারগুলো দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন। দুপুরেই জানা যাবে, ট্রাইব্যুনালের রায়ে জাসদ সভাপতির ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।
