রাজধানী ঢাকার তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত যানজট নিরসনে ১২০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মোড়ে (Intersections) বসানো হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও থার্ড-আই ক্যামেরা। এই মেগা প্ল্যানের প্রথম ধাপে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাজধানীর ৭৬টি মোড়ে এই এআই-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম পুরোদমে চালুর চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মহাতীর্যক এই আধুনিকায়ন পরিকল্পনাটি নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গত সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত’ এক উচ্চ-পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সভায় এই মহাপরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতি ও বাণিজ্যবিষয়ক দৈনিক ‘বণিক বার্তা’-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও স্বস্তির তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
সভা সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সরাসরি মাঠপর্যায়ে সমন্বয় করে এই আধুনিক প্রযুক্তি বাস্তবায়ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকবে ঢাকা উত্তর (DNCC) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (DSCC)। ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কগুলোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ট্র্যাডিশনাল বা ম্যানুয়াল থেকে মুক্ত করে ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় (Automatic) করতেই এই রূপান্তর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এর অর্থায়ন কাঠামো। সভায় ডিএমপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই যুগান্তকারী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের রাজকোষ থেকে অতিরিক্ত কোনো বাজেট বা বিশেষ তহবিলের (Special Fund) প্রয়োজন হবে না। পুলিশের নিজস্ব উদ্বৃত্ত তহবিল থেকেই এই পুরো উদ্যোগের ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হবে।
এর আগে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর জাহাঙ্গীর গেট, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের মোড়গুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে (Pilot Project) এই আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হয়েছিল। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BUET) বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা এই উন্নত সিগন্যাল বাতিগুলো তৈরি করেছেন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার পাশাপাশি আপদকালীন সময়ে ট্রাফিক পুলিশ ম্যানুয়ালিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এসব পয়েন্টে এআই (AI) প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে ডিএমপি। এই এআই-ভিত্তিক হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরার সাথে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ লঙ্ঘন (যেমন—লেন অমান্য করা, হেলমেট না পরা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো বা জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি দাঁড় করানো) স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার জন্য বিশেষায়িত সফটওয়্যার সংযোজন করা হয়েছে। ফলে কোনো চালক আইন ভাঙলে এআই ক্যামেরাই তাঁর গাড়ির নম্বর প্লেট স্ক্যান করে সরাসরি সেন্ট্রাল সার্ভারে ই-মামলা ও জরিমানার স্লিপ পাঠিয়ে দেবে। পুরো কার্যক্রমের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (DTCA)।
ডিটিসিএ (DTCA) থেকে প্রাপ্ত ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যালের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এই মহানগরে প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল বসেছিল ১৯৬০-এর দশকে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়। এরপর প্রযুক্তির আধুনিকায়নে কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশি ঋণ নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি:
| সময়কাল | অর্থায়নকারী সংস্থা | কতটি মোড় | বর্তমান স্থিতি |
| ১৯৯৯ – ২০০৫ | বিশ্বব্যাংক (World Bank) | ৬৮টি স্থানে | ২০০৯ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ অচল |
| ২০০৯ – ২০১৯ | বিশ্বব্যাংক (World Bank) | ৯১টি ইন্টারসেকশন | আলোর মুখ দেখেনি, কার্যকর করা যায়নি |
| ২০১৪ – ২০১৮ | জাইকা (JICA – জাপান) | ৪টি ইন্টারসেকশন | কিছুদিন চলেই পুরোপুরি অকার্যকর |
অতীতে শত শত কোটি টাকা খরচের পরও ঢাকার সিগন্যাল বাতিগুলো সচল রাখা যায়নি এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশকে হাতের ইশারায় বা কাঠের লাঠি দিয়েই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। তাই ২০২৬ সালের এই এআই-নির্ভর বর্তমান উদ্যোগটি নগরবাসীর মনে ব্যাপক স্বস্তির বার্তা দিলেও, এর টেকনিক্যাল ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং জাইকা বা বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্টের মতো এটিও যেন অকেজো না হয়ে পড়ে—তা নিশ্চিত করাই এখন ডিএমপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
