বিয়ের মাত্র ৪৮ দিনে শেষ ২৬ বছরের জীবন: মুম্বাইয়ে সিসিটিভি নজরদারি ও ডাক্তার স্বামীর নির্যাতনে গৃহবধূর আত্মহত্যা

ভারতের মহারাষ্ট্রের মুম্বাই সংলগ্ন থানে জেলার আম্বারনাথে এক চরম চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। পেশায় চিকিৎসক স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনপ্রদীপ নিজ হাতেই নিভিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন ২৬ বছর বয়সী তরুণী বিশাখা তিলকর।

বিশাখার পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আম্বারনাথের শিবাজিনগর থানা পুলিশ মূল অভিযুক্ত ডাক্তার স্বামী নিতিন তিলকর-কে গ্রেপ্তার করেছে। তবে ঘটনার পর থেকে শাশুড়ি ও দেবর পলাতক রয়েছেন।

মামলার এজাহার ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬ সালের গত ৩০ এপ্রিল অত্যন্ত ধুমধাম করে বিশাখার সঙ্গে পেশায় চিকিৎসক নিতিন তিলকরের বিয়ে হয়েছিল। তবে বিয়ের পর থেকেই সেই সোনার সংসার বিশাখার জন্য এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়। সংসারটি টিকে ছিল মাত্র ৪৮ দিন।

বিশাখার মা-বাবার অভিযোগ, বিয়ের সময় পাত্রপক্ষের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ দামি উপহার এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ‘রাজকীয় সম্মান’ না পাওয়ায় বিয়ের প্রথম দিন থেকেই শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা বিশাখার ওপর চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিয়ের কয়েক দিন পর থেকেই বাপের বাড়ি থেকে আরও লাখ লাখ টাকা এবং সোনার গয়না এনে দিতে বিশাখার ওপর শুরু হয় নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক চাপ।

এই ঘটনার সবচেয়ে লোমহর্ষক দিক হলো বিশাখার ওপর চালানো সাইকোপ্যাথিক বা মনস্তাত্ত্বিক নজরদারি। বিশাখার পরিবার জানায়, আম্বারনাথের ওই বাড়ির ভেতরে ও বাইরে চারপাশ সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা দিয়ে মুড়ে রেখেছিলেন ডাক্তার স্বামী নিতিন তিলকর। বিশাখা সারাদিন ঘরে কী করছেন, কার সাথে বসছেন—তার প্রতিটি সেকেন্ডের মুভমেন্ট ২৪ ঘণ্টা নিজের মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে লাইভ নজরদারিতে রাখতেন স্বামী। এর ফলে বিশাখার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

পরিবারের এক সদস্য অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে গণমাধ্যমকে জানান:

“বিশাখা যাতে নিজের কষ্টের কথা কাউকে না বলতে পারেন, তাই তাঁকে পুরোপুরি বন্দি করে রাখা হয়েছিল। যখনই তিনি ঘরের বাইরে গিয়ে কারও সঙ্গে দুটি কথা বলতেন, স্বামী দূর থেকে সিসিটিভিতে তা দেখে রাতে বাড়ি ফিরেই বিশাখাকে পশুর মতো নির্মমভাবে মারধর করত। এমনকি আত্মহত্যা করার ঠিক দুদিন আগেও, এক নারী প্রতিবেশীর সঙ্গে সামান্য কথা বলার ‘অপরাধে’ তাঁকে ঘর আটকে প্রচণ্ড পেটানো হয়েছিল। এই তীব্র অপমান ও গভীর হতাশা সহ্য করতে না পেরে আমার বোন নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে।”

মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেও বিশাখা ফোনে তাঁর মাকে ডেস্পারেটলি কল করে তাঁর ওপর হওয়া এই পৈশাচিক নির্যাতনের কথা কান্নাকাটি করে জানিয়েছিলেন। বিশাখার বাবা-মা তাঁকে উদ্ধার করে নিজেদের বাড়ি ফিরিয়ে আনার আইনি প্রস্তুতি নেওয়ার মাঝেই খবর পান, তাঁদের আদরের মেয়ে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

এই ঘটনায় আম্বারনাথের শিবাজিনগর থানায় বিশাখার স্বামী নিতিন তিলকর, শাশুড়ি ছায়া তিলকর এবং দেবর নিনাদ তিলকরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে—১. পণ বা যৌতুকের জন্য নির্যাতন, ২. মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক হেনস্তা এবং ৩. আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার (Abetment of Suicide) কঠোর ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূল ঘাতক স্বামী নিতিনকে ইতিমধ্যে লোহার গরাদের পেছনে পাঠানো হয়েছে এবং পলাতক শাশুড়ি ও দেবরের খোঁজে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ টিম পাঠিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *