দেশে কোনো অবস্থাতেই ধর্ষক ও মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের পক্ষে কেউ সুপারিশ বা তদবির করতে আসলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অপরাধীদের পক্ষে তদবিরকারী ব্যক্তি যদি কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাও হন, তবে সেই নেতাকেও অপরাধের সহযোগী হিসেবে একই মামলায় গ্রেপ্তার করে হাজতে পাঠানো হবে।
গতকাল বুধবার (১৭ জুন, ২০২৬) দুপুরে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এই কঠোর বার্তা দেন। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এম মজিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কামালুজ্জামান, সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান সোহেল, মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল আলম, পুলিশ সুপার মিয়া মো. আশিস বিন হাসান এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করে সভায় বলেন, “আইন সবার জন্য সমান। কোনো ধর্ষক কিংবা সমাজ ধ্বংসকারী মাদক ব্যবসায়ীর পক্ষে কোনো ধরনের সুপারিশ বরদাশত করা হবে না। তদবিরকারী আমার নিজের দল (বিএনপি) কিংবা অঙ্গসংগঠনের নেতা হলেও বিন্দুমাত্র রেহাই পাবেন না। অপরাধীকে যে আড়াল করতে চাইবে, সে-ও অপরাধী।”
মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মক্ষেত্রে অবহেলা ও সময়ানুবর্তিতার অভাব নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, “স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টায় অফিস আদালত শুরু করেন। কিন্তু জেলা ও উপজেলার অনেক সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে এখনো ঠিক সময়ে অফিসে আসার ক্ষেত্রে এক ধরণের অনীহা ও গাফিলতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কর্মকর্তারা যদি স্ব-স্ব স্থান থেকে নিজেদের অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে এবং সততার সাথে পালন করেন, তবে সমাজ বা রাষ্ট্রে কোনো সংকট বা জনভোগান্তি থাকবে না।”
জনভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা (Efficiency) বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক ছাতার নিচে সব সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুততম সময়ে দেশব্যাপী ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ (One-stop Service) চালুর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মেগা দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে পৌনে চার কিলোমিটার একটি গ্রামীণ রাস্তা করতে প্রথমে ৬০-৭০ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছিল, যা পরে জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে ২৮০ কোটি টাকার অবাস্তব প্রস্তাব করা হয়! আমরা বর্তমান প্রশাসনের মাধ্যমে এটি কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় একনেক (ECNEC) বৈঠকে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ স্থগিত করেছি। রাষ্ট্রের টাকা বেশুমার লুটপাট ও বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা পাচার বন্ধে এখন প্রতিটি নতুন ও চলমান প্রকল্পের বাস্তব উপযোগিতা কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।”
সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘স্মার্ট’ ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হয়ে গেছে। তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ভারত সীমান্তে মাদক পাচারে আধুনিক ‘ড্রোন’ (Drone Technology) ব্যবহার করছে। শুধু তাই নয়, আদালতে আইনি ফাঁকফোকর গলে জামিন পেতে তারা এখন কৌশলে একসাথে বেশি মাদক না এনে অত্যন্ত অল্প পরিমাণে (যেমন ১০-১৫ পিস) মাদক বহন করে। ফলে বিচারকরাও আইনের মারপ্যাঁচে ও পরিমাণের দিকে তাকিয়ে সহজে জামিন দিয়ে দিচ্ছেন। এদের কঠোরভাবে দমনে সরকার আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী ও কঠোর করবে।”
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “এই বাজেট অত্যন্ত চিন্তাশীল, সুদূরপ্রসারী, উচ্চাভিলাষী এবং প্রকৃত অর্থেই একটি জনকল্যাণের বাজেট। বিএনপি সবসময় দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের অধিকারের রাজনীতি করে বলেই এই জনবান্ধব বাজেট নিয়ে রাজপথে কোনো নেতিবাচক মিছিল-মিটিং বা জনগণের ক্ষোভ নেই।”
