বাংলাদেশজুড়ে সরবরাহকৃত ও উত্তোলিত খাবার পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিক ও আয়রনের পরিমাণ সব ধরনের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করেছে। দেশের ৬৪টি জেলার ভূগর্ভস্থ পানিতেই আর্সেনিকের উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫৪টি জেলার টিউবওয়েলের পানিতে এর পরিমাণ ‘মাত্রাতিরিক্ত’। বিজ্ঞানভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত দেশব্যাপী এক চাঞ্চল্যকর যৌথ গবেষণার প্রতিবেদনে এই লোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ সায়েন্স ল্যাবরেটরি (BCSIR) ও বিএসটিআই (BSTI)-এর বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসলেও, সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত এর প্রতিকারে কিংবা তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা তৈরিতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত এই তথ্যের পর দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, ক্যানসার বিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্যবিদরা আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের ভয়াবহ দূরগামী শারীরিক ক্ষতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন:
- মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ: তিনি জানান, মাত্রাতিরিক্ত আয়রন ও আর্সেনিকযুক্ত পানি দীর্ঘ সময় ধরে পান ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করলে মানবদেহের ফুসফুস, লিভার, হার্ট, কিডনি, চোখ ও নাক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে জয়েন্টে তীব্র ব্যথা ও চর্মরোগের পাশাপাশি স্কিন ক্যানসার ও চরম রক্তশূন্যতা (Anemia) দেখা দেয়।
- গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটের ডা. এনামুল করিম: তিনি সতর্ক করে বলেন, আর্সেনিক ও আয়রনের এই নীরব বিষ সরাসরি মানুষের লিভারকে অকেজো (Liver Cirrhosis) করে দেয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেহের সব প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্থায়ী ক্ষতিসাধন করে।
- ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির: তিনি দেশের ক্যানসার পরিস্থিতির ভয়াবহ রূপ তুলে ধরে বলেন, একসময় শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসা হতো। বর্তমানে আলাদা বিশেষায়িত সরকারি ক্যানসার হাসপাতাল এবং প্রতিটি সরকারি মেডিকেলে পৃথক ইউনিট থাকা সত্ত্বেও রোগীরা শয্যা পাচ্ছেন না, সময়ে ভর্তি হতে পারছেন না। বাজারে ভেজাল খাদ্যসামগ্রী এবং এই বিষাক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের কারণেই দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য দিয়েছেন দেশের শিশু ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা। পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে এই বিষ এখন সরাসরি মায়ের গর্ভ থেকে শিশুদের শরীরে প্রবেশ করছে:
- ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস-এর যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম: তিনি জানান, বিষাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে গর্ভবতী মায়ের পেটের সন্তানের স্নায়ুতন্ত্র (Nervous System) অকেজো হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা জন্ম থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও পক্ষাঘাতসহ বিভিন্ন মারাত্মক নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়বিক সমস্যা নিয়ে পৃথিবীতে আসছে। এই ধরনের জটিলতা নিয়ে প্রতিদিন প্রচুর শিশু নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে ভর্তি হচ্ছে।
- শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সফি আহমেদ মোয়াজ ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোশতাক হোসেন: তাঁরা উল্লেখ করেন, গর্ভে থাকাকালে আর্সেনিকের সংস্পর্শে আসায় অনেক শিশু জন্ম থেকেই স্কিন ক্যানসার ও কিডনি বিকলতার মতো রোগ নিয়ে জন্মাচ্ছে। দেশে মা ও শিশুর অকাল মৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অনালোচিত কারণ এই আর্সেনিক দূষণ।
সায়েন্স ল্যাবরেটরির সিনিয়র বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে খাবার পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৫০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত নির্ধারণ করা আছে (যদিও উন্নত দেশ ও আমেরিকায় এই অনুমোদিত মাত্রা মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম)। এর বেশি হলেই তা বিষ হিসেবে গণ্য হয়। বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ভূগর্ভস্থ ও সাপ্লাইয়ের পানি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ওয়াসার পরিশোধিত পানি, অনুমোদিত বোতলজাত পানি এবং আকাশের বৃষ্টির পানি সম্পূর্ণ নিরাপদ। বৃষ্টির পানিতে কোনো আর্সেনিক বা আয়রন থাকে না।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সায়েন্স ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা স্বল্পমূল্যের ও সাশ্রয়ী ‘ফাস্টফ্লাশ’ (Fast-flush) নামক একটি প্রযুক্তিভিত্তিক যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। এই যন্ত্রটি ঘরের টিনের কোণায় কিংবা ভবনের একপাশে সহজে স্থাপন করা যায়। যন্ত্রটিতে দুটি ছোট পাইপ থাকে—একটি পাইপ দিয়ে বৃষ্টির শুরুর ময়লা পানি বের হয়ে যায় এবং অপরটি দিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, বিশুদ্ধ ও আর্সেনিকমুক্ত পরিষ্কার পানি জমা হয়। এই পানি কোনো খরচ ছাড়াই দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে নিরাপদে পান করা সম্ভব।
এদিকে, বাজারে জালিয়াতি রোধে বিএসটিআই-এর পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অনুমোদনহীন ও নকল বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী জেলের মতো বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে।
