লন্ডনে হাসনাত আবদুল্লাহর সভায় তীব্র উত্তেজনা: আওয়ামী লীগ-এনসিপি হাতাহাতি, ডিম নিক্ষেপ ও ৩ জন আটক

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে এক রাজনৈতিক সফরে গিয়ে প্রবাসী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নজিরবিহীন তোপ ও তোপের মুখে পড়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা এবং বর্তমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য (MP) হাসনাত আবদুল্লাহ। সভাস্থল অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ, ডিম নিক্ষেপ এবং দুপক্ষের মধ্যে দফায় দফায় হাতাহাতির ঘটনায় লন্ডনের সাধারণ প্রবাসীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের (লন্ডন পুলিশ) একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

গত সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) স্থানীয় সময় বিকেলে পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল সংলগ্ন ‘ইস্ট লন্ডন মসজিদ’ এর পাশের মায়েদা গ্রিল রেস্টুরেন্টে ‘এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স’ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সভা শুরুর আগে বিকেলে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও তাঁর সহযোগীরা পূর্ব লন্ডনের এলেম পার্ক (Altab Ali Park সংলগ্ন এলাকা) এলাকায় হাঁটার সময় হঠাৎ করেই যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী তাঁদের অনুসরণ করতে শুরু করেন। এ সময় তাঁরা হাসনাত আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন স্লোগান ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য ছুঁড়ে দেন।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর সহযোগীদের নিয়ে মায়েদা গ্রিল রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নেন। এ সময় আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা রেস্টুরেন্টের বাইরে অবস্থান নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন এবং রেস্টুরেন্ট লক্ষ্য করে একের পর এক ডিম নিক্ষেপ করতে থাকেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ডিমের আঘাতে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক এহতেশামুল হকের পাঞ্জাবি নষ্ট হয়ে যায়।

এরই একপর্যায়ে এনসিপি নেতা এহতেশামুল হকের সঙ্গে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শাহ শামীমের তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা রক্তাক্ত হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তিতে রূপ নেয়।

উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতির কারণে ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক ব্রিটিশ পুলিশ ও বিশেষ রায়ট ভ্যান মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, বাইরে আওয়ামী লীগের কয়েকশ কর্মীর তুমুল বিক্ষোভ ও অবরুদ্ধ অবস্থার কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৩ ঘণ্টা পর রাত ৯টার দিকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন এবং সভা শেষে পুলিশের বিশেষ সুরক্ষায় সভাস্থল ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যান।

ইস্ট লন্ডন থানা পুলিশ ও স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, সভাস্থল এবং এর আশপাশের রাস্তায় প্রকাশ্য শান্তিভঙ্গ, সরকারি কাজে বাধা এবং মারামারির দায়ে লন্ডন পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অন্তত তিনজনকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করেছে।

আটককৃতদের মধ্যে লন্ডন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফসার খান সাদেক রয়েছেন বলে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ব্রিটিশ পুলিশ আফসার খান সাদেককে হাতকড়া পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলছে। তবে আটককৃত বাকি দুজনের পরিচয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা বা প্রি-অ্যারেস্ট চার্জ গঠন করা হয়েছে, সে বিষয়ে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

লন্ডনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে ‘এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স’ এর পক্ষ থেকে রাতেই একটি কড়া সাংগঠনিক বিবৃতি জারি করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, “সোমবারে এলেম পার্ক এলাকায় হাসনাত আবদুল্লাহ ও এহতেশামুল হকের পূর্বনির্ধারিত সফরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও উশৃঙ্খল কর্মী সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও উসকানিমূলক কাপুরুষোচিত আচরণ করেছে।”

এনসিপির বিবৃতিতে আরও যোগ করা হয়:

“ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা এবং পরমতঅসহিষ্ণুতার নোংরা ও ফ্যাসিবাদের রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগ এখনো বিন্দুমাত্র বেরিয়ে আসতে পারেনি। বাংলাদেশের আপামর জনগণ ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমেই এই ধরনের হিংসাত্মক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান করেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা, বিরোধী মতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা এবং ক্ষমতার অন্ধ অহংকারই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ডেকে এনেছিল। লন্ডনের মাটিতে এই হামলা প্রমাণ করে তারা এখনো অতীত থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *