বাংলাদেশে জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজের জন্মসনদ তৈরি করে অপ্রাপ্তবয়স্ক বর-কনের আসল বয়স লুকিয়ে বাল্যবিবাহ দেওয়ার চক্রান্ত এবার কঠোরভাবে রুখে দিতে যাচ্ছে সরকার। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিয়ের আইনি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল বা কাগজের জন্মসনদের পরিবর্তে বাধ্যতামূলকভাবে শতভাগ অনলাইন বা ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন রেকর্ড (BRIS) ব্যবহার করার বিধান যুক্ত করে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭’ সংশোধনের চূড়ান্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কুমিল্লা-৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দলীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের লিখিত জবাবে এই চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী তথ্য নিশ্চিত করেছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন।
জাতীয় সংসদে মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF) এবং ইউএনএফপিএ (UNFPA)-এর প্রত্যক্ষ কারিগরি ও আইনি সহায়তায় বর্তমানে এই নতুন সংশোধিত আইনের খসড়া (Draft Legislation) তৈরির কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।
মন্ত্রী তাঁর লিখিত জবাবে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিদ্যমান ২০১৭ সালের আইনের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র (Special Circumstances) সুযোগ নিয়ে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাল্যবিবাহ দেওয়ার যে আইনি ফাঁকফোকর বা লুপহোল ছিল, তা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত ও বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এই সংশোধনীর মূল বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্য হবে—ডিজিটাল ডেটাবেজ যাচাই। কাজি বা বিবাহ নিবন্ধক বর ও কনের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন আইডি সরকারি সার্ভারে প্রবেশ করিয়ে সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই বিবাহ সম্পন্ন বা নিবন্ধন করতে পারবেন না। জালিয়াতির কাগজের সনদ দিয়ে যারা বয়স বাড়িয়ে বিয়ে দিত, এই ডিজিটাল রেকর্ড বাধ্যতামূলক করার ফলে তাদের সেই অবৈধ প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন দেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সংসদে আরও বলেন, “আমাদের দেশে এখনো একটি বড় অংশের বিয়ে কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই কেবল ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে (সামাজিকভাবে) সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। কোনো ধরনের সরকারি বা আইনি নিবন্ধন না থাকায় মাঠপর্যায়ে এই অননিবন্ধিত বাল্যবিবাহগুলোর ওপর সঠিক নজরদারি করা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও জটিল হয়ে পড়ে।”
এই সামাজিক ব্যাধি ও অপরাধকে সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল করতে মন্ত্রী কেবল আইনের ওপর ভরসা না রেখে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ, স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জেলা জজ আদালত, সম্মানিত সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার প্রতিনিধিদের একযোগে ‘সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ’ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা গড়ে তোলার জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
