কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিনের উত্তর-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে ফিশিং বোটের ইঞ্জিন বিকল হয়ে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মৃত্যুর মুখে ভাসতে থাকা একটি মাছ ধরার ট্রলারসহ ১০ জন জেলেকে অলৌকিকভাবে জীবিত ও অক্ষত উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। সোমবার (২৯ জুন) রাতে কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এক অফিশিয়াল সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কোস্ট গার্ডের পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার টেকনাফের ঐতিহ্যবাহী শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রিপাড়া ঘাট থেকে ‘এফবি সামিহা’ নামের একটি বাণিজ্যিক ফিশিং বোট ১০ জন পেশাদার জেলেকে সঙ্গে নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সমুদ্রে কয়েকদিন সফলভাবে অবস্থান করার পর সোমবার (২৯ জুন) সকাল ৯টার দিকে সেন্ট মার্টিনের উত্তর-পশ্চিমে গভীর সমুদ্রে আকস্মিকভাবে বোটটির মূল ইঞ্জিনটি বিকল হয়ে পড়ে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রলারটি উত্তাল সাগরের তীব্র ঢেউয়ের তোড়ে ভাসতে শুরু করলে জেলেদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও চরম উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক এবং দ্রুততম সময়ের সফল অভিযান
গভীর সমুদ্রে ভাসতে থাকা অবস্থায় ট্রলারটি যখন উপকূল থেকে ক্রমশ দূরে বিপজ্জনক দিকে সরে যাচ্ছিল, ঠিক তখন দুপুর ১টার দিকে বোটে থাকা প্রধান মাঝি ভাগ্যক্রমে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পান। তিনি আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে কোস্ট গার্ডের টেকনাফস্থ শাহপরী স্টেশনে ফোন করে তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা ও উদ্ধার তৎপরতার আকুল আবেদন জানান। সাগরে জেলেদের বিপদের খবর পাওয়ামাত্রই কোস্ট গার্ডের শাহপরী স্টেশনের স্টেশন কমান্ডারের নির্দেশনায় একটি সুসজ্জিত উদ্ধারকারী দল অত্যাধুনিক নৌযান নিয়ে গভীর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে দ্রুত রওনা হয়।
কোস্ট গার্ডের উদ্ধারকারী দলটি আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকিং ও মাঝির দেওয়া আনুমানিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সেন্ট মার্টিনের উত্তর-পশ্চিমের গভীর সমুদ্রে চিরুনি অনুসন্ধান চালায়। অত্যন্ত প্রতিকূল ঢেউ ও বৈরী সমুদ্র পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অবশেষে কোস্ট গার্ডের দলটি বিকল হয়ে পড়া ফিশিং বোট ‘এফবি সামিহা’র অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সাগরে ভাসতে থাকা ১০ জন জেলেকে সম্পূর্ণ জীবিত, সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে কোস্ট গার্ডের মূল উদ্ধারকারী জাহাজে নিয়ে আসা হয়।
প্রাথমিক চিকিৎসা এবং মালিকপক্ষের কাছে হস্তান্তর
উদ্ধারের পর কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে আতঙ্কগ্রস্ত ও ক্ষুধার্ত থাকা জেলেদের দ্রুত পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং প্রয়োজনীয় ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে ওঠার পর কোস্ট গার্ডের উদ্ধারকারী দল উদ্ধার হওয়া ১০ জেলে এবং বিকল ফিশিং বোটটিকে নিরাপদে উপকূলে ফিরিয়ে আনে।
সোমবার বিকেলেই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বোট এবং জেলেদের তাদের স্বজন ও আসল মালিকপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিজেদের স্বজনদের ফিরে পেয়ে জেলেদের পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা তার বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করেন, বঙ্গোপসাগর তথা বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমায় যেকোনো ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা রোধ, চোরাচালান দমন এবং সাগরে মাছ করতে যাওয়া সাধারণ জেলেদের সার্বিক নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড অতীতেও কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের যেকোনো জরুরি উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
