ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলা এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করেছে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তবে মিছিলটি বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। মহাসড়কের চট্টগ্রামগামী লেনে মিছিলটি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরবর্তীতে খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে ৪৫ জনকে আটক করেছে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশ। একই সাথে মিছিলকারীদের ব্যবহৃত ২টি মিনিবাস এবং ৩টি হায়েস (Hiace) মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে।
রোববার (৭ জুন, ২০২৬) দুপুরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা সংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গণ-আটকের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর থেকে পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংশ্লিষ্ট অংশে এবং আশেপাশের এলাকায় চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও নির্ভরযোগ্য দলীয় সূত্রগুলো জানায়, রোববার দুপুরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার অন্তর্গত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামগামী লেনের মাটিয়ারা নামক স্থানে হঠাৎ জড়ো হয় একদল ছাত্রলীগ কর্মী। সেখানে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল পিয়াসের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। মিছিলটি মহাসড়কের ওপর দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে চট্টগ্রাম অভিমুখে কিছুটা অগ্রসর হয়।
তবে মিছিলটি মাটিয়ারা এলাকা পার হয়ে চাষাপাড়া নামক স্থানে পৌঁছানোর পূর্বেই সেখানে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। ছাত্রলীগের মিছিলের খবর পেয়ে বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে মিছিলকারীদের ধাওয়া করে। বিএনপির আকস্মিক ও তীব্র ধাওয়ার মুখে ছাত্রলীগের মিছিলটি পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং নেতা-কর্মীরা দিকবিদিক দিগভ্রান্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
মহাসড়কে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশের একাধিক টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ও পালানোর পথগুলোতে ব্লক রেইড দিয়ে তল্লাশি শুরু করে।
অভিযান শেষে পুলিশ ঘটনাস্থল এবং এর আশেপাশের এলাকা থেকে সন্দেহভাজন ৪৫ জনকে আটক করতে সক্ষম হয়। এছাড়া মিছিলকারীদের বহনে ব্যবহৃত এবং মহাসড়কের পাশে ফেলে যাওয়া ২টি মিনিবাস ও ৩টি বিলাসবহুল হায়েস মাইক্রোবাস জব্দ করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
এই বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, “মহাসড়কে একটি সংগঠনের মিছিল ও ধাওয়া-ধাওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ৪৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে থানা হেফাজতে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আটকদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং তারা কোথা থেকে কেন এসেছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া ও প্রাথমিক যাচাই শেষে আটকদের নাম ও পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।” ওসি আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে জব্দকৃত ২টি মিনিবাস ও ৩টি মাইক্রোবাস বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং এ বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
কুমিল্লার এই ঝটিকা মিছিলের ঘটনার সাথে সাম্প্রতিক নোয়াখালীর রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীর সংযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে গত শুক্রবার (৫ জুন) নোয়াখালীর পৃথক দুটি স্থানে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা অনুরূপ দুটি ঝটিকা মিছিল করেছিল। সেই সময় মিছিলকারীরা শেখ হাসিনার পক্ষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি ‘মব, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির’ বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান দেয়। পরবর্তীতে নোয়াখালীর সেই মিছিলের কিছু ছবি ও ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। নোয়াখালীর ওই জোড়া মিছিলের ঘটনায় পরবর্তীতে পুলিশি অভিযানে ২৪ জন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াখালীর ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, যারই ধারাবাহিকতা রোববারে কুমিল্লার এই ঝটিকা মিছিল। তবে কুমিল্লায় বিএনপি ও পুলিশের যৌথ তৎপরতায় ছাত্রলীগের এই প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল। বর্তমানে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা ও সংলগ্ন মহাসড়ক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা রুখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
