২০২৬ বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে নেইমারের ক্যারিয়ারের ‘লাস্ট ড্যান্স’

নানা ঘাত-প্রতিঘাত, চোটের ধাক্কা আর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিয়েছেন সমসাময়িক ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা নেইমার জুনিয়রের। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ও অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ডের জন্য জাতীয় দলে ফেরার পথটা একেবারেই সহজ ছিল না। হাইপ্রোফাইল কোচ কার্লো আনচেলত্তি সেলেসাওদের কোচের দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ালেও, দলীয় স্কোয়াডে জায়গা পাননি নেইমার; এক প্রকার উপেক্ষিতই থেকেছেন তিনি। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ আড়াই বছর পর আবারও ব্রাজিলের ‘হলুদ শিবিরে’ ডাক পড়েছে এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ডের। তার এই প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মাঝে নতুন করে বিশ্বকাপ জয়ের উন্মাদনা ও আশার আলো তৈরি করেছে।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবং চোট বড় কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ালে, ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে নেইমারের ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ আসর। তবে বিশ্বমঞ্চে মাঠে নামার আগেই এই তারকা ফুটবলার ভক্তদের জন্য এক কিছুটা মন খারাপ করা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগামী ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ টুর্নামেন্ট।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের (ফিফা) অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে করা একটি পোস্টে মন্তব্য করে নেইমার নিজেই এই ঘোষণা দেন। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে নেইমারের আগের খেলা তিনটি বিশ্বকাপের কিছু স্মরণীয় ও আবেগঘন ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই পোস্টের নিচে মন্তব্য করতে গিয়ে নেইমার সংক্ষেপে লেখেন, ‘The Last Dance’ (দ্য লাস্ট ড্যান্স)। এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ২০২৬ সালের বিশ্বমঞ্চেই তিনি তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি লিখে যেতে চান।

ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমার জুনিয়রের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে, ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে। প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে দুর্দান্ত খেললেও চোটের কারণে সেমিফাইনালে খেলতে পারেননি তিনি এবং সেবার তাঁর দল সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নেয়। এরপর ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও ব্রাজিলের আক্রমণভাগের মূল কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। তবে দুর্ভাগ্যবশত, এই দুটি আসরেই ব্রাজিলকে কোয়ার্টার ফাইনাল বা শেষ আট থেকেই চোখের জলে বিদায় নিতে হয়েছিল।

নেইমার এবার তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের ট্রফি খরা ঘোচাতে মরিয়া। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে সর্বশেষ পঞ্চমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেলেসাওরা। এরপর গত ২৪ বছরে ব্রাজিল আর কোনো বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। নেইমারের লক্ষ্য, নিজের শেষ আন্তর্জাতিক মিশনটিকে স্মরণীয় করে রেখে ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ) জয়ের স্বপ্ন পূরণ করা।

বর্তমানে নেইমার গ্রেড-২ কাফ ইনজুরি বা পায়ের পেশির চোট থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। তবে চিকিৎসকদের সূত্রমতে, তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং শিগগিরই পুরোদমে অনুশীলনে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই চোটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পানামার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি তিনি। যদিও নেইমারকে ছাড়াই সেই ম্যাচে ৬-২ গোলের বড় ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল। এর আগে মিশরের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচেও মাঠের বাইরেই কাটাতে হয়েছিল এই তারকাকে।

চোটের কারণে প্রত্যাশিতভাবেই পানামা ম্যাচের একাদশে তাঁর নাম ছিল না। আর এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণেই ফুটবল মহলে ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের উদ্বোধনী ম্যাচে খেলার জন্য নেইমার হয়তো শতভাগ ফিট হতে পারবেন না।

নেইমারের চোট নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে শঙ্কা থাকলেও ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি কিন্তু বেশ ইতিবাচক। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ব্রাজিলের পুরো কোচিং স্টাফ আশা করছে বিশ্বকাপের শুরু থেকেই নেইমারকে পুরোপুরি ফিট অবস্থায় দলের সাথে পাওয়া যাবে। এমনকি মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের উদ্বোধনী ম্যাচ কিংবা তার ঠিক পরের ম্যাচেই নেইমারকে মাঠে নামানোর ব্যাপারে আশাবাদী কোচ।

আনচেলত্তি জোর দিয়ে আরও বলেন, বর্তমান স্কোয়াডের শক্তির ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং বিশ্বকাপের মূল আসরের আগে তিনি ঘোষিত স্কোয়াডে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে চান না। বিশ্বকাপের জন্য যে সমস্ত খেলোয়াড়কে স্কোয়াডে ডাকা হয়েছে, চোট বা ফর্ম যা-ই থাকুক না কেন, তারা সবাই মূল দলের সঙ্গেই থাকবেন এবং দলের রণপরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ করবেন।

ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বকাপে নেইমারের আক্ষেপটা অনেক বড়। বিশ্বমঞ্চে এ পর্যন্ত ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সি গায়ে মোট ১৩টি ম্যাচ খেলেছেন নেইমার। এই ১৩ ম্যাচে তিনি নিজে ৮টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩টি গোল (অ্যাসিস্ট)।

বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর সর্বশেষ গোলটি এসেছিল ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। সেই ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে দুর্দান্ত এক গোল করে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন নেইমার। তবে পরবর্তীতে ক্রোয়েশিয়া গোলটি পরিশোধ করলে ম্যাচটি ১-১ সমতায় অতিরিক্ত সময় শেষ হয়। এরপর রদ্রিগো এবং মার্কিনহোসের পেনাল্টি মিসের কারণে টাইব্রেকারে হেরে অত্যন্ত নির্মমভাবে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এবার সেই সব অতীত দুঃখ ভুলে আনচেলত্তির অধীনে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার নতুন স্বপ্নে বিভোর নেইমার জুনিয়র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *