বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন খাতের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক কারসাজির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এক নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আওয়ামী লীগ আমলের সেই সব বিতর্কিত পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি)। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে পরিসংখ্যানের সবকিছু এখন ‘ফরেনসিক রিভিউ’ বা চুলচেরা বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার আওতায় আনা হচ্ছে।
রোববার (৭ জুন, ২০২৬) দুপুরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অবস্থিত নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। এ সময় তিনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম রোধ, আসন্ন বাজেট এবং আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন, মতবিনিময় সভায় পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। জোনায়েদ সাকি বলেন, “আমরা দেশের মানুষের সামনে এবং আন্তর্জাতিক মহলে একদম নির্ভুল তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে চাই।
বিগত সরকারের মতো কোনো পরিসংখ্যান আমরা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখতে চাই না। বরং দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা ও ক্ষতগুলো ঠিক কোথায়, তা স্পষ্টভাবে জানতে চাই।” তিনি জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পূর্ববর্তী সমস্ত তথ্য-উপাত্ত এখন গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিবিএস-এর তথ্যে কোনো ধরনের কারসাজি বা জালিয়াতি করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিবিএস-কেই নিজস্ব তথ্য পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আরও যোগ করেন, দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি বা নিত্যপণ্যের বাজারের ঊর্ধ্বগতি। বিগত দিনে মূল্যস্ফীতির যে হিসাব দেখানো হতো, তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
তাই মূল্যস্ফীতি আসলে কীভাবে গণনা করা হয় এবং এর পেছনের পদ্ধতিগত কোনো গলদ বা কারসাজি ছিল কি না, তাও বর্তমান সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখবে। ভবিষ্যতে যেন কোনো তথ্যে কারসাজি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর নামে বিগত দিনে যে হরিলুট এবং দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা বন্ধে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, যেসব প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে, সেগুলোকেও পুনরায় কঠোর পর্যালোচনার আওতায় আনা হচ্ছে, যেন কোনো ধরনের অপচয় বা দুর্নীতি না ঘটে।
উন্নয়ন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, “ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট প্রকল্প না নিয়ে, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় একগুচ্ছ সমজাতীয় বা একই ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হতে পারে। এতে কাজের গুণগত মান বজায় রাখা এবং তদারকি করা সহজ হবে।” একই সাথে প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) উদ্দেশ্যে এক হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, অহেতুক প্রকল্পের সময় কিংবা খরচ বৃদ্ধির কোনো রকম দায় সরকার নেবে না; এর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদেরই। এই লক্ষ্যে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রকল্প পরিচালকদের একটি সুনির্দিষ্ট ‘পুল’ তৈরির নীতিমালা প্রণয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।” আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে দেশের প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, এবারের বাজেটে দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিগত দিনে মেগা প্রজেক্টের নামে সাধারণ খাতগুলোকে যেভাবে অবহেলা করা হয়েছে, সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসছে বর্তমান সরকার। জোনায়েদ সাকি বলেন, “এবারের বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো জনকল্যাণমূলক খাতগুলোতে বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষ যেন সরাসরি বাজেটের সুফল ভোগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে স্বীকার করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত আমলের লুটপাটের কারণে দেশের আর্থিক খাত যে গভীর সংকটে পড়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইনি ও গাঠনিক সংস্কার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি খাতের সংকট নিরসনে পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার ওপর জোর দেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সুসংহত করতে একটি সম্পূর্ণ ‘আত্মনির্ভরশীল ও টেকসই জ্বালানি নীতি’ তৈরির জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার, যা দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতকে দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখতে সাহায্য করবে।
