‘বাংলাদেশি সন্দেহে’ সীমান্তে পুশব্যাক: বিএসএফের বিরুদ্ধে অমানবিক আচরণের তীব্র নিন্দা ও এপিডিআরের বিক্ষোভের ডাক

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘বাংলাদেশি সন্দেহে’ সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশব্যাক) চেষ্টা করছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস’ (এপিডিআর) ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে এই গুরুতর অভিযোগ এনেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় কথিত ও সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করে জোরপূর্বক পুশইন বা পুশব্যাক করার এক ভয়ংকর প্রবণতা শুরু হয়েছে। এই চরম অমানবিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আগামী ১১ জুন পশ্চিমবঙ্গের মালদা শহরে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে এপিডিআর।

রোববার (৭ জুন, ২০২৬) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে এপিডিআর এই উদ্বেগের কথা প্রকাশ করে। সংগঠনটি দাবি করেছে, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক দল ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিশেষ নীতিমালার কারণে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনমনীয় অবস্থানের কারণে সীমান্তরেখার ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা জিরো পয়েন্টে এক নারকীয় ও অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এপিডিআর তাদের বিজ্ঞপ্তিতে এই সংকটের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পটভূমি ব্যাখ্যা করেছে। সংগঠনটির দাবি, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন হিসেবে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ করেছিল যে, তারা ক্ষমতায় এলে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের দমনে ‘ডিটেক্ট, ডিপোর্ট, ডিলিট’ (Detect, Deport, Delete) বা ‘থ্রি-ডি’ নীতি গ্রহণ করবে। এর অর্থ হলো প্রথমে তথাকথিত অবৈধ অধivacীদের চিহ্নিত করা হবে, এরপর তাদের নাগরিক তালিকা বা ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

মানবাধিকার সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতা গ্রহণের পর পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই নীতি বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। এর অংশ হিসেবে বিএসএফের কার্যপরিধি বৃদ্ধি এবং তাদের হাতে অতিরিক্ত জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজনদের আটকে রাখার জন্য বিতর্কিত ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটককেন্দ্র (ডিটেনশন ক্যাম্প) সচল করা হয়েছে। এই প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোর পরপরই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে কথিত বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশব্যাক করার प्रक्रिया শুরু হয়।

এপিডিআরের বিজ্ঞপ্তিতে সীমান্ত এলাকার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ এবং ‘মানবেতর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, বিএসএফ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা যেমন—মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার সীমান্ত এলাকাগুলোতে রাতের অন্ধকারে কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে কথিত বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মানুষকে ধরে নিয়ে আসছে। এদের মধ্যে একটি বড় অংশই অসহায় নারী ও নিষ্পাপ শিশু।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসএফ সদস্যরা এই সমস্ত মানুষকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে নিয়ে গিয়ে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে, জোরপূর্বক বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে ঢুকে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। কোনো প্রকার বৈধ নথিপত্র বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না বিজিবি।

এর ফলে এক ভয়ংকর ত্রিমুখী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বিএসএফের বন্দুকের নল এবং বিজিবির কঠোর পাহারার মাঝখানে পড়ে শত শত মানুষ ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ দিনের পর দিন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। এদের মধ্যে গর্ভবতী নারী, দুগ্ধপোষ্য শিশু ও বৃদ্ধরা রয়েছেন। খোলা আকাশের নিচে, প্রচণ্ড রোদ, আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কোনো প্রকার খাদ্য ও পানীয় জল ছাড়া তারা দিনাতিপাত করছেন। মৌলিক মানবাধিকারের ন্যূনতম সুবিধাবঞ্চিত এই মানুষদের অবস্থা এখন চরম সংকটাপন্ন।

মানবাধিকার সংগঠনটি দুই দেশের সশস্ত্র ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করে বলেছে, বিএসএফ মানুষকে নো ম্যানস ল্যান্ডে ফেলে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের দায়িত্ব অস্বীকার করছে। বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, আটককৃতরা অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, তাই তাদের ব্যাপারে ভারতের কোনো আইনি বা মানবিক দায়িত্ব থাকতে পারে না।

অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর স্পষ্ট বক্তব্য, জিরো পয়েন্টে আটকে থাকা ব্যক্তিরা যে বাংলাদেশের নাগরিক, তার কোনো প্রমাণ ভারতীয় পক্ষ দেখাতে পারেনি। বিজিবির মতে, যেহেতু এই ব্যক্তিরা ভারতের অভ্যন্তর থেকে এসেছে এবং ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের নিয়ে এসেছে, তাই তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবেই গণ্য হবেন। ফলে আইনি নথিপত্র ছাড়া কাউকে বাংলাদেশের ভেতরে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

এপিডিআর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, “দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর বন্দুকের সামনে খাবার ও পানীয় জলহীন এক ভয়ংকর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে বেশ কিছু মানুষ। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এই অনমনীয় ও নিষ্ঠুর মনোভাবের কারণে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটছে।”

এপিডিআরের সহসভাপতি ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী রঞ্জিত শূর ভারতের এই ‘থ্রি-ডি’ নীতিকে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক, বেআইনি এবং বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের এই নীতি দেশটির নিজস্ব সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। ভারতের সংবিধানের প্রধান দুটি ধারার উল্লেখ করে রঞ্জিত শূর বলেন: ১. ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ: এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থানকারী সমস্ত ব্যক্তির (তিনি ভারতের নাগরিক হোন বা বিদেশি) আইনের চোখে সমানাধিকার এবং সমান আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ২. ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ: এই অনুচ্ছেদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ভারতের সীমানার ভেতরে থাকা প্রতিটি মানুষের জীবন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার রক্ষা করে।

এপিডিআরের মতে, কোনো মানুষের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। আদালত কর্তৃক প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে জোরপূর্বক অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া বা খোলা আকাশের নিচে বন্দি করে রাখা ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের চরম অবমাননা।

এই মানবিক বিপর্যয় রোধে মানবাধিকার সংগঠনটি ভারত সরকারের কাছে অবিলম্বে ‘পুশব্যাক’ বা পুশইনের মতো অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী নীতি বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে নো ম্যানস ল্যান্ড বা জিরো পয়েন্টে বিএসএফের মাধ্যমে ফেলে আসা সমস্ত অসহায় মানুষকে অবিলম্বে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। রঞ্জিত শূর আরও জানান, সীমান্তে মানবতার বিরুদ্ধে এই অপরাধের বিষয়ে তারা জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের (UNHRC) দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন এবং এই সংকট নিরসনে বিশ্বসংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।

সীমান্তে চলমান এই অমানবিক পুশব্যাক প্রক্রিয়া বন্ধ এবং আটককেন্দ্রগুলো ভেঙে দেওয়ার দাবিতে আগামী ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা জেলা মালদায় এক বিশাল প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে এপিডিআর। সংগঠনটির মালদা জেলা শাখা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। এপিডিআর পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের প্রগতিশীল জনতা, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষকে এই মিছিলে শামিল হয়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার আহ্বান জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *