পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে শোচনীয় পরাজয় ও ক্ষমতা হারানোর পর তীব্র অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। একদিকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের ধাক্কা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দলীয় কাউন্সিলরদের ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দলটি। এই সংকটকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রশমিত করতে রোববার (৭ জুন, ২০২৬) কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) তৃণমূল কাউন্সিলরদের নিয়ে একটি অত্যন্ত জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন দলীয় সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে শেষ মুহূর্তে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বৈঠকটি বাতিল করে দিয়েছেন তিনি।
তৃণমূল ভবন থেকে ইতিমধ্যে প্রতিটি কাউন্সিলরের কাছে বৈঠক বাতিলের আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তুমুল জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুতির পর তৃণমূলের অন্দরে যে চরম সমন্বয়হীনতা এবং আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, এই বৈঠক বাতিল তারই এক স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
তৃণমূলের শীর্ষ দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ও কলকাতায় তৃণমূলের কাউন্সিলর এবং স্থানীয় নেতারা সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে চলা দুর্নীতি ও স্থানীয়স্তরে নানাবিধ অনিয়মের কারণে জনমনে যে ক্ষোভ জমা ছিল, তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চরম নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন অনেক তৃণমূল কাউন্সিলরই। ফলস্বরূপ, দলনেত্রীর ডাকা এই জরুরি বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত হতে অনেকেই তীব্র অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।
এর পাশাপাশি, রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের পক্ষ থেকে তৃণমূল নেতৃত্বকে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দেওয়া হয়েছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষুব্ধ জনতা ও বিরোধী সমর্থকেরা কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের ওপর প্রকাশ্য রাস্তায় পচা ডিম কিংবা টমেটো ছুড়তে পারে, যা দলের ভাবমূর্তি আরও ধূলিসাৎ করবে। দলীয় সূত্রের দাবি, এমন এক প্রতিকূল ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং দলের অভ্যন্তরীণ ফাটল আড়াল করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ মুহূর্তে বৈঠকটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন।
কলকাতা পুরসভার বৈঠক বাতিল হলেও হাতছাড়া হওয়া রাজ্যের বুকে পুরসভার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় নতুন মেয়র নির্বাচনের আইনি প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং কাউন্সিলরদের ক্ষোভ ও হামলা থেকে বাঁচাতে এক সম্পূর্ণ বিকল্প ও গোপন কৌশল অবলম্বন করেছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, জনসমক্ষে বা তৃণমূল ভবনে বড় কোনো সভা না করে, একদম গোপনে শহরের বিভিন্ন নিরাপদ ও অজ্ঞাত স্থানে কাউন্সিলরদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে ডাকা হচ্ছে। সেখানে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নতুন মেয়রের নাম প্রস্তাব করা হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কাউন্সিলরদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, প্রকাশ্য জনরোষ এড়াতে কোনো রাজনৈতিক দলের এভাবে গোপনে পুরসভার কাজ পরিচালনা করার ঘটনা কলকাতায় সত্যিই নজিরবিহীন।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন তৃণমূলের ওপর আইনি চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত শুক্রবার (৫ জুন) কলকাতার বিদায়ী মেয়র ফিরহাদ হাকিম তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দেন। এর ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ শনিবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় নতুন রাজ্য সরকারের পৌর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের পক্ষ থেকে কলকাতা পুরসভাকে (কেএমসি) একটি কড়া আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার কেএমসি (KMC) আইনের ১১৭(১) ধারা উল্লেখ করে জানতে চেয়েছে যে, মেয়রের পদত্যাগের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কেন তৃণমূলের বর্তমান পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে না? উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে ফিরহাদ হাকিমসহ মেয়র পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং বেশ কয়েকজন বোরো চেয়ারম্যান পদত্যাগ করায় কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক কাঠামো গভীর সংকটে পড়েছে। এই নোটিশকে কেন্দ্র করে বর্তমানে কেএমসির চেয়ারপারসন মালা রায় এবং রাজ্য সরকারের পৌর দপ্তরের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক ও আইনি লড়াই শুরু হয়েছে, যা পুরো পুরসভাকে এক চরম আইনি জটিলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তৃণমূলের এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পেছনে দলটির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও নেতাদের বেপরোয়া আচরণকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। গত ৪ মে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফল প্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত কলকাতার বিভিন্ন এলাকা থেকে দুর্নীতি, তোলাবাজি (চাঁদাবাজি) এবং নারীদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কলকাতা পুরসভার অন্তত আটজন তৃণমূল কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই গ্রেপ্তারির ঘটনাগুলো তৃণমূলের নৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে এবং কাউন্সিলরদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
রাজ্যে যখন দল ভাঙন ও আইনি সংকটের মুখে, ঠিক তখনই জাতীয় রাজনীতির পরিমণ্ডলে যোগ দিতে আগামীকাল সোমবার (৮ জুন) দিল্লিতে বিরোধী দলগুলোর ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য হাতছাড়া হলেও জাতীয় স্তরে নিজের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতেই তাঁর এই সফর বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মমতার সফরের আগেই, পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও জোটের অন্যান্য নেতাদের সাথে প্রাথমিক আলোচনার উদ্দেশ্যে গত শনিবারই দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারী সরকারের আইনি ও প্রশাসনিক সাঁড়াশি অভিযান, অন্যদিকে দলের ভেতরে কাউন্সিলরদের বিদ্রোহ ও জনরোষ—এই দুই ফ্রন্টে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে তৃণমূলের অস্তিত্ব এবং কলকাতার পুরবোর্ড রক্ষা করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
