ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে পুরুষ তারকাদের বয়স ৫০ বা ৬০ পেরোলেও পর্দায় তাঁদের তরুণী নায়িকাদের সঙ্গে রোমান্স করতে দেখা যায় নিয়মিত। অথচ নারী অভিনয়শিল্পীদের ক্ষেত্রে ৩০ বছর বয়স পার হওয়াকেই ক্যারিয়ারের ‘অদৃশ্য দেয়াল’ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সম্প্রতি ‘টাইমস এন্টারটেইনমেন্ট’-কে দেওয়া এক অকপট ও সাহসী সাক্ষাৎকারে এই জেন্ডার ও বয়স বৈষম্যকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ‘বিশাল বড় মানসিক ব্যাধি’ বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী তাপসী পান্নু।
তাপসী জানান, ক্যারিয়ারের শুরুতে মাঝ-কুড়ির বয়সে বলিউডে পা রেখেও প্রথম তিন-চার বছর শক্তিশালী চরিত্র পাওয়ার জন্য তাঁকে তীব্র লড়াই করতে হয়েছে। আর যখন নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করলেন, তখনই তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় লিঙ্গভিত্তিক নতুন এক অদ্ভুত সমস্যা।
“বলিউডে নিজেকে একজন দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে করতেই আমার বয়স ৩০ পেরিয়ে যায়। আর ঠিক তখনই একদল নীতিনির্ধারক আমাকে বললেন, তুমি আর রোমান্টিক–কমেডি ছবিতে প্রধান নায়িকা হওয়ার জন্য যথেষ্ট তরুণ নও। চিত্রনাট্যে কম বয়সী মেয়ের প্রয়োজন না থাকলেও পরিচালকেরা জোর করে কম বয়সী নতুনদেরই খোঁজেন। অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে ৫০-৬০ বছর বয়সেও এই নিয়ম বা ছক কখনোই খাটানো হয় না।”
বলিউডের পাশাপাশি দক্ষিণী (সাউথ) ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার সময়ও আরও সংকীর্ণ মানসিকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে জানান তাপসী। তিনি বলেন, সেখানে তুলনামূলক বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রতিষ্ঠিত কোনো শীর্ষ নায়কের বিপরীতে অভিনয় করার পর, সমসাময়িক তরুণ নায়কেরা তাঁর সঙ্গে আর কাজ করতে চাইতেন না। তাঁদের ধারণা ছিল, ‘ও তো সিনিয়র অভিনেতার নায়িকা হয়ে গেছে, তাই আমাদের সাথে আর মানাবে না।’
এই সংকীর্ণতার তীব্র সমালোচনা করে এবং পুরুষ সুপারস্টারদের একচেটিয়া সুবিধার দিকে আঙুল তুলে তাপসী প্রশ্ন করেন,
“এই কথা কি কেউ কখনো বলিউড বাদশা শাহরুখ খানকে বলতে সাহস পাবে? শাহরুখ খানের সঙ্গে কাজ করার পর তো একজন নবাগত অভিনেত্রীর পুরো জীবন ও ক্যারিয়ারই রাতারাতি বদলে যায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রিতে সবসময় এমন একধরনের অদ্ভুত ও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা বা ট্যাবু কাজ করত, যা ভীষণ হতাশাজনক।”
দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রির এই অসম পরিস্থিতি ও নোংরা ইঁদুরদৌড়ের মুখোমুখি হতে হতে একসময় তীব্র হতাশা এবং মানসিক ক্লান্তির শিকার হন তাপসী। তবে এখন তিনি নিজের মানসিক শান্তির জন্য এই রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছেন এবং তথাকথিত বাণিজ্যিক বা কমার্শিয়াল সিনেমার পেছনে দৌড়ানো বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি নিজের বাস্তবের বয়সের সঙ্গে মানানসই এবং যেসব চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে শিল্পীমন তৃপ্ত হয়, কেবল সেই ধরণের ওটিটি ও ভিন্নধর্মী সিনেমাতেই বেছে বেছে কাজ করছেন। তাপসী পান্নুকে সর্বশেষ দেখা গেছে খ্যাতনামা পরিচালক অনুভব সিনহার তুমুল আলোচিত কোর্টরুম ড্রামা ‘অ্যায়সি’ (Aisi) সিনেমায়। ছবিটিতে তিনি একজন লড়াকু আইনজীবীর চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন, যিনি ধর্ষণের শিকার এক অসহায় নারীর জন্য ন্যায়বিচার আদায়ে আদালতের ভেতর একাই লড়াই করেন। ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা ও বাহবা পেলেও বক্স অফিসে আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। তবে বর্তমানে একটি জনপ্রিয় ওটিটি বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ছবিটি দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে।
