নাটোরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম দায়িত্বহীনতা এবং অবহেলায় এক নারী ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত স্বজন ও এলাকাবাসী হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। এ সময় হাসপাতাল কর্মচারী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরবর্তীতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে ক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালটি অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে রোববার (২৮ জুন) গভীর রাতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রাত আনুমানিক ৩টার দিকে হাসপাতালের মালিক বাবলুকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
অক্সিজেন খুলে দেওয়ায় মৃত্যুর অভিযোগ:
নিহত রোগীর স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাটোর শহরের হরিশপুর এলাকার বাসিন্দা এবং পূবালী ব্যাংক নাটোর শাখার কর্মচারী রুনা বেগম রোববার দুপুরে হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে নাটোর সদর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাতে উন্নত চিকিৎসার আশায় রুনাকে শহরের ‘আল সান হাসপাতাল’ নামে একটি স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীর অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে জরুরি অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়। তবে স্বজনদের অভিযোগ, রাত ১১টার দিকে হাসপাতালের মালিক বাবলু কোনো যৌক্তিক কারণ বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই হঠাৎ করে রোগীর মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেন। অক্সিজেন লাইফ সাপোর্ট বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথেই ছটফট করতে করতে রুনার মৃত্যু হয়।
ভাঙচুর, সংঘর্ষ ও মালিক আটক:
অক্সিজেন খুলে দেওয়ার পর রুনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর স্বজন এবং স্থানীয় এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁরা আল সান হাসপাতালে চড়াও হয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। এ সময় হাসপাতালের নার্স ও কর্মচারীরা বাধা দিতে এলে রোগীর স্বজনদের সাথে তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেঁধে যায়। ঘটনার পর হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা পালিয়ে যান।
উত্তেজিত জনতা হাসপাতালের প্রধান ফটক আটকে বিচার চেয়ে স্লোগান দিতে থাকেন এবং হাসপাতালটি অবরুদ্ধ করে রাখেন। খবর পেয়ে নাটোর সদর থানা পুলিশের একটি বড় দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। পরে রাত ৩টার দিকে মূল অভিযুক্ত ও হাসপাতালের মালিক বাবলুকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও আইনগত পদক্ষেপ:
এই মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনছুর রহমান জানান, “হাসপাতালে এক নারী রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও ভাঙচুরের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাসপাতালের মালিক বাবলুকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে।”
উল্লেখ্য, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। এর আগে চট্টগ্রামের সাজিনাস হাসপাতালেও অনুরূপ ভুল চিকিৎসায় এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল, যা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। নাটোরের এই ঘটনাটি চিকিৎসাসেবার নামে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর অরাজকতাকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
