নির্মাণ শেষ হতেই ধস ৯ কোটির সড়কে, নকশা ও পরিকল্পনায় বড় ভুলের প্রমাণ পেল তদন্ত কমিটি

গাজীপুরের শ্রীপুরে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার পাকা সড়কের একটি বড় অংশ ধসে গেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, সড়কটির মূল নকশা এবং সামগ্রিক পরিকল্পনায় মারাত্মক ত্রুটি ও ভুল থাকার কারণেই এই ধসের সৃষ্টি হয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের রাজাবাড়ি-দমদমা সড়কটি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বরে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মো. সাদেক।

নির্মাণকাজ শেষ হতে না হতেই সড়ক ধসে পড়ার ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে এলজিইডি সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এলজিইডির ঢাকা বিভাগীয় আঞ্চলিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

সোমবার ওই বিশেষ তদন্ত কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত সড়কটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে কমিটির প্রধান আবুল মনজুর মো. সাদেক সাংবাদিকদের বলেন, “সড়কটির নকশা ও পরিকল্পনায় শুরু থেকেই বড় ধরনের ভুল ছিল। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনা না করেই সড়কটির লে-আউট দেওয়া হয়। সে কারণেই নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরপরই সূতি নদীর তীরে থাকা অংশটি ধসে পড়েছে।” তিনি আরও জানান, আগামী এক দিনের মধ্যেই এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সূতি নদীঘেঁষা চিনাশুকানিয়া গ্রামের কাছে সড়কের বিশাল একটি অংশ ইতোমধ্যে দেবে গেছে। সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। নদীভাঙন রোধে তীরে যে সমস্ত প্রটেকশন ব্লক বসানো হয়েছিল, সেগুলো ভেঙে ও উপড়ে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। ফলে এই সড়কটি দিয়ে বর্তমানে যেকোনো ধরনের যানবাহন চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের এই বেহাল দশায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনগণ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়ন থেকে প্রহলাদপুর ইউনিয়নের দমদমা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার সড়ক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২১ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। মেসার্স সালাম ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়।

প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারের ঢিলেমি ও বিভিন্ন অজুহাতে নির্মাণকাজ শেষ হতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যায়। দীর্ঘ পাঁচ বছর ঝুলে থাকার পর চলতি বছরে কাজ শেষ হলেও মাত্র তিন মাসের মাথায় সড়কটি ধসে পড়ে। ফলে নির্মাণকাজের মান, ত্রুটিপূর্ণ নকশা এবং প্রকল্প তদারকি নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে।

তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি স্থায়ীভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং এ লক্ষ্যেই তদন্ত কমিটিতে দুজন বিশেষজ্ঞ নকশাবিদকে রাখা হয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কাজের পুরো বিল তুলে নেওয়ার পর, নতুন করে এই স্থায়ী সংস্কারের অর্থ কোন খাত থেকে আসবে— সাংবাদিকদের এমন সুনির্দিষ্ট ও সরাসরি প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি এই কর্মকর্তা। এতে পুরো বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

একই দিনে গাজীপুরের শ্রীপুরে পরকীয়ার জেরে স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগে এক নারীকে ছুরি ও চাপাতিসহ গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে, যা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *