রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ভেনেজুয়েলার ওপর যেন নতুন করে এক চরম মরণকামড় দিল প্রকৃতি। গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন, ২০২৬) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার জাতীয় সংসদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ রাজধানী কারাকাসে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, বুধবারে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত ১৮৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহত ১ হাজার ৫২০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সংসদ সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি থাকা এবং কারাকাসের অন্যতম প্রধান বন্দর নগরী লা গুয়াইরা (La Guaira) অঞ্চলটি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তিনি একে ‘ব্যাপক মাত্রার এক জাতীয় বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভূমিকম্পের তীব্রতায় লা গুয়াইরা ও সংলগ্ন কারাকাসের অন্তত ২৫০টি বহুতল ভবন ও আবাসিক স্থাপনা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উদ্ধারকারী দলগুলোর আশঙ্কা—ভেঙে পড়া এসব বহুতল ভবনের কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অন্তত ২০০ জনেরও বেশি মানুষ জীবন্ত বা মৃত অবস্থায় আটকা পড়ে আছেন। দেশটির প্রত্যন্ত ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলো থেকে ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে মৃতের সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ডেলসি রদ্রিগেজ উপদ্রুত ও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঞ্চলটি সশরীরে পরিদর্শন করে উদ্ধারকাজের তদারকি করছেন। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ার্স বা এমএসএফ (MSF) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভূমিকম্প কবলিত লা গুয়াইরাসহ দেশের একটি বিশাল অংশে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
ভূমিকম্পের আঘাতে প্রধান পাওয়ার গ্রিড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লা গুয়াইরার সিংহভাগ এলাকা এখনও সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন বা ব্ল্যাকআউটের মধ্যে রয়েছে। এমএসএফ আরও জানিয়েছে, গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত হওয়া হাজার হাজার আতঙ্কিত মানুষকে তাৎক্ষণিক মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে স্থানীয় কয়েকটি পৌরসভার বড় বড় ক্রীড়া কেন্দ্র ও ইনডোর স্টেডিয়ামগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার এই চরম জাতীয় দুর্যোগের মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দী থাকা ভেনেজুয়েলার বিতর্কিত ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এক বিশেষ বার্তার মাধ্যমে দেশের অবরুদ্ধ ও বিপর্যস্ত দেশবাসীর প্রতি গভীর ঐক্য, সহমর্মিতা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন।
এদিকে এই মানবিক সংকটে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আশ্বাস দিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়:
- জাতিসংঘ ও কানাডা: জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং কানাডার নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই ভয়াবহ প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক মানবিক ও কারিগরি সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
- বিরোধী দল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: স্পেনে নির্বাসিত ভেনেজুয়েলার প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতা এডমুন্ডো গঞ্জালেজ এক বিবৃতিতে কারাকাস সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে কোনো ধরণের ‘রাজনৈতিক শর্ত বা বৈরিতা ছাড়াই’ আন্তর্জাতিক উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তা গ্রহণ করা উচিত। এর পরপরই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় ‘বৃহৎ, দ্রুত ও অত্যন্ত কার্যকর’ একটি বিশেষ মার্কিন মানবিক প্যাকেজ ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
