একসময় ধান, চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাইকারি বেচাকেনায় দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা সরগরম থাকত ঐতিহ্যবাহী মিরকাদিম বন্দর। দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও ঐতিহাসিক এই নৌ-বাণিজ্য কেন্দ্রটি এখন তীব্র নাব্য সংকট, অভ্যন্তরীণ খাল দখল-দূষণ এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনায় নিজস্ব জৌলুশ হারিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধলেশ্বরী নদীর নাব্য সংকটের কারণে ভরা বর্ষা মৌসুমেও মিরকাদিম লঞ্চঘাটে এখন আর লঞ্চ ভিড়তে পারছে না। নিয়মিত যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত অভ্যন্তরীণ প্রাণবন্ত খালগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দখল ও বর্জ্যের দূষণের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। জলপথে পণ্য পরিবহন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্থলপথেও সরু ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে ভারী যানবাহন চলাচলে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
ধস নেমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে, কমেছে রাজস্ব
নৌপথ ও স্থলপথের এই ত্রিমুখী সমস্যার কারণে মিরকাদিমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শতাব্দী প্রাচীন ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একসময়ের তিন শতাধিক ধানের চাতাল ও চালের আড়তের অধিকাংশই এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। একইভাবে ডাল, তেল, আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন নামী শিল্পকারখানা ও পাইকারি ব্যবসাও সংকুচিত হয়ে এসেছে। এখানকার বিখ্যাত মাছের আড়তেও আগের তুলনায় মাছের সরবরাহ অনেক কমে গেছে।
একসময় ২৪ ঘণ্টা হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা ঘাট এখন অনেকটাই নির্জীব ও সুনসান। ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক লেনদেন হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে এলাকায় থাকা চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখাও বাধ্য হয়ে কমলাঘাট এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাচুর্যের কারণে যে মিরকাদিমকে ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ নামে ডাকা হতো, সেই মিরকাদিম এখন নিজের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে।
ঘাট স্থানান্তর ও বিআইডব্লিউটিএ-এর বক্তব্য
এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রিকাবীবাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মিরকাদিমের কাঠপট্টি এলাকায় লঞ্চঘাট স্থানান্তরের পর থেকেই এই নাব্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। বর্তমানে নতুন ঘাটটি ধলেশ্বরী নদীর মূল চ্যানেল থেকে বেশ দূরে ও পলি জমে থাকা অগভীর এলাকায় অবস্থিত হওয়ায়, বারবার ড্রেজিং (নদী খনন) করেও পর্যাপ্ত পানি বা নাব্য ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে কায়ক্লেশে লঞ্চ চালাতে হচ্ছে, যার কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আশার আলো ও জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাস
এই অচলাবস্থা নিরসনে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দ্রুত নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা, অবরুদ্ধ খালগুলো উদ্ধার করে পুনরায় নৌচলাচল চালু করা এবং জরাজীর্ণ সড়ক যোগাযোগের আধুনিকায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রাচীন এই নদীবন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব চিরতরে হারিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে মিরকাদিম পৌরসভার প্রশাসক ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বলেন, “মিরকাদিম বন্দরের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন অত্যন্ত আন্তরিক। আমরা ইতিমধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঐতিহাসিক ‘নয়নের খাল’ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমে নদী খননসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধানেও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।”
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতন এই বিষয়ে বলেন, “মিরকাদিমের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব পুনরুদ্ধারে সরকার বদ্ধপরিকর। নৌপথ, খাল ও সড়ক অবকাঠামোর সামগ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে এই বন্দরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আবারও সচল করতে আমরা দ্রুতই প্রয়োজনীয় ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছি।”
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই বাণিজ্যকেন্দ্রটি আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে—প্রশাসন ও সরকারের এমন আশ্বাসে বুক বাঁধছেন মিরকাদিমের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।
