বিশ্বজুড়ে করোনা বা অন্যান্য মহামারির রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটের ফ্রন্টলাইন তৈরি হয়েছে ইউরোপে। গত বুধবার (২৪ জুন, ২০২৬) ফরাসি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, কঙ্গোয় ফ্রন্টলাইন চিকিৎসা সেবা দিয়ে সম্প্রতি দেশে ফেরা এক চিকিৎসকের শরীরে ইবোলা পজিটিভ এসেছে। শনাক্তের পরপরই ফরাসি মহামারি নিয়ন্ত্রণ প্রোটোকল অনুযায়ী তাঁকে প্যারিসের একটি উচ্চ-সুরক্ষিত বিশেষায়িত হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং কঙ্গো থেকে একই ফ্লাইটে বা মিশন শেষে ফেরা অন্যান্য কর্মীদের জন্য ফ্রান্সে একটি উচ্চ-পর্যায়ের বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা (Surveillance System) চালু করা হয়েছে।
ইবোলা মূলত একটি বিরল, অত্যন্ত মারাত্মক এবং উচ্চ মৃত্যুহারসম্পন্ন (High Mortality Rate) সংক্রামক ভাইরাস। এটি মানবদেহে প্রবেশ করে সরাসরি মানুষের রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে এবং শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
১৯৭৬ সালে কঙ্গো এবং সুদানের প্রত্যন্ত ইবোলা নদীর অববাহিকায় প্রথম এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল, যা বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী ‘ফ্রুট ব্যাট’ (ফলখেকো বাদুড়) বা শিম্পাঞ্জি থেকে প্রথম মানুষের শরীরে ছড়িয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের এই জুনে এসে বিশ্বজুড়ে নতুন করে চরম আতঙ্ক তৈরির মূল কারণ হলো ইবোলার সম্পূর্ণ নতুন ও প্রাক্কলিত ভ্যারিয়েন্ট ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo Ebola)। ২০০৭ সালে উগান্ডার বুন্দিবুগিও জেলায় প্রথম এই স্ট্রেইনটি শনাক্ত হয়েছিল বিধায় এর এমন নামকরণ।
গত মাসে ডিআর কঙ্গোতে এই নতুন প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঙ্গো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মহামারি ঘোষণার বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই অলক্ষ্যে ভাইরাসটি জনপদে ছড়াচ্ছিল। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
- আক্রান্ত ও মৃত্যু: আফ্রিকায় ইতিমধ্যে ১ হাজারেরও বেশি মানুষ এই নতুন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
- ভ্যাকসিনহীন সংকট: ইবোলার সাধারণ স্ট্রেইনের ভ্যাকসিন থাকলেও, বর্তমানের এই ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতির ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণিত প্রতিষেধক, ঔষধ বা ভ্যাকসিন এখনও পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কার হয়নি।
- সম্মুখসারির যোদ্ধারা আক্রান্ত: এটি যেহেতু আক্রান্ত মানুষের লালা, রক্ত বা শরীরের অন্যান্য তরল পদার্থের (Bodily Fluids) সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কঙ্গোয় ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৭ জন চিকিৎসক ও নার্স প্রাণ হারিয়েছেন।
ইবোলা পরিস্থিতি নিয়ে জেনেভায় আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রধান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসাদের খুঁজে বের করার আন্তর্জাতিক ট্র্যাকিং প্রক্রিয়া (Contact Tracing) এখনো অত্যন্ত দুর্বল। এছাড়া আফ্রিকার আইসোলেশন সেন্টারগুলোতে পর্যাপ্ত আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও লজিস্টিকসের তীব্র অভাব রয়েছে। যার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আন্তর্জাতিক চেষ্টার চেয়ে ভাইরাসের বিস্তারের গতি অনেক বেশি।
