ব্রাজিলের জয় উদ্‌যাপন ঘিরে সংঘর্ষ: আদাবরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক ১০

ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জয় উদ্‌যাপন ও আনন্দ মিছিলকে কেন্দ্র করে রাজধানীর আদাবরে বিএনপি নেতা আবুল বাশারকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত আবুল বাশার আদাবরের নবোদয় হাউজিং ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) রাজধানীজুড়ে চিরুনি অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ১০ জনকে আটক করেছে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ও শুক্রবার (৩ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত ও সালিস বৈঠক

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাতে ফুটবল বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়ের পর স্থানীয় কয়েকজন কিশোর ঢোল ও বাঁশি বাজিয়ে আনন্দ মিছিল করছিল। এ সময় আনন্দ উদ্‌যাপনে বাধা দিয়ে হাবিব নামের এক ব্যক্তি নীরব নামের এক যুবককে মারধর করেন।

এই ঘটনার জেরে পরের দিন বুধবার আদাবর ইউনিট বিএনপির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন (৩৫) নবোদয় হাউজিং বাজার এলাকায় গিয়ে নীরবকে আবারও মারধর করেন এবং তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি নেতারা বিষয়টি মীমাংসা করার উদ্যোগ নেন।

বুধবার রাতে নবোদয় কাঁচাবাজারে হাবিবের কার্যালয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে একটি সালিস বৈঠক বসে। কিন্তু সালিস শেষে সাদ্দাম ও তার সমর্থকেরা নীরব ও তার বড় ভাই রিপনের ওপর হামলার চেষ্টা চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুপক্ষের মধ্যে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।

ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও মৃত্যু

সংঘর্ষের একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আদাবর ইউনিট বিএনপির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় দুজনকে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত পৌনে ১২টার দিকে আবুল বাশারকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত সাদ্দাম হোসেন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও আটক

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর ও আদাবর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জুয়েল রানা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে আদাবরের নবোদয় হাউজিং এলাকা থেকে শোয়েব, আরমান ও নয়ন নামের তিনজনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, নিহত আবুল বাশারের মরদেহ দাফনের জন্য স্বজনরা গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলে গেছেন। তারা ফিরে এসে আদাবর থানায় আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলা দায়ের করবেন। মামলা দায়েরের পর আটক এই তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছে অন্যান্য সংস্থাও। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে চারজন এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) তিনজনকে আটক করেছে। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, ডিবির হাতে আটক চারজনকে নিয়ে বিকেলে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হবে।

পুলিশ কর্মকর্তা জুয়েল রানা আরও উল্লেখ করেন, বুধবার রাতের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনার আগেই সাদ্দাম হোসেন আদাবর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। পুরো ঘটনার পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিখুঁতভাবে যাচাই করে দেখছে পুলিশ।

নিহত আবুল বাশারের স্বজনরা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আদাবরের বি-ব্লকে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন পরিবার ও স্থানীয় রাজনৈতিক সহকর্মীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *