হামের প্রকোপে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, একদিনে নতুন আক্রান্ত ১,১০৭

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১০৭ শিশু। এর মধ্যে ১৩৯ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং বাকি ৯৬৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।

শুক্রবার (৩ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল। তবে এই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

সাড়ে তিন মাসে ৭২৯ শিশুর মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৭২৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৯৩ জন। বাকি ৬৩৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে।

একই সময়ে সারাদেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬১ জনে। তাদের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ১২ হাজার ৪২৫ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি ৮৭ হাজারের বেশি শিশু

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন মাসে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৭ হাজার ২৬২ শিশুকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, চিকিৎসা শেষে এ পর্যন্ত ৮৩ হাজার ৫৪৩ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, দ্রুত শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কারণে অধিকাংশ শিশুকে সুস্থ করা সম্ভব হয়েছে। তবে গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা। যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা পায়নি বা টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়েছে, তারা সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন শিশু এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের মধ্যে হামের জটিলতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এ কারণে অভিভাবকদের শিশুদের টিকাদান সম্পন্ন করার পাশাপাশি জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি কিংবা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আহ্বান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও সময়মতো টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময়ে প্রতিটি শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে অভিভাবকদের প্রতি সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে অধিদপ্তর বলেছে, শিশুদের মধ্যে হামের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে বাড়িতে চিকিৎসা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা নিশ্চিত করলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকাগুলোতে পর্যবেক্ষণ, রোগ শনাক্তকরণ এবং টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *