দেশজুড়ে সর্বনাশা মাদকের চোরাচালান, তরুণ সমাজের অবক্ষয় এবং মাদক সিন্ডিকেটের প্রযুক্তিগত আগ্রাসন রুখতে জিরো টলারেন্স (Zero Tolerance) নীতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে নতুন সরকার। আজ শুক্রবার (২৬ জুন, ২০২৬) আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই মেগা পরিকল্পনার কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এতদিন মাদকবিরোধী জটিল অভিযানগুলোতে আমাদের পুলিশ সদস্যরা প্রায় নিরস্ত্র বা সাধারণ অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। কিন্তু মাদক কারবারিরা এখন অনেক বেশি উগ্র ও সশস্ত্র। তাই আইন সংশোধনের মাধ্যমে এবার থেকে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে পুলিশকে অত্যাধুনিক ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হবে।”
তিনি আরও জানান, কেবল অস্ত্রই নয়, মাদক চোরাচালানের প্রবেশ পথগুলো সিল করতে এবং আইনি প্রক্রিয়াকে নিশ্ছিদ্র করতে সংশোধিত আইনে বেশ কিছু নতুন বৈপ্লবিক বিধান যুক্ত করা হচ্ছে:
- ডগ স্কোয়াড গঠন: দেশের প্রতিটি বড় সীমান্ত, বিমানবন্দর ও চেকপোস্টে মাদক নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের জন্য শক্তিশালী ‘ডগ স্কোয়াড’ (Dog Squad) গড়ে তোলা হবে।
- বিশেষ হাজতখানা ও ল্যাব: মাদক মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের পর তাদের সাধারণ অপরাধীদের থেকে আলাদা রাখতে বিশেষ আধুনিক হাজতখানা এবং দ্রুততম সময়ে মাদকের কেমিক্যাল টেস্ট নিশ্চিত করতে ‘আধুনিক পরীক্ষাগার’ (Modern Laboratory) স্থাপনের আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে।
- অনলাইন জুয়া ও অবৈধ লেনদেন দমন: বর্তমান সময়ে মাদকের টাকা ও অপরাধের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত হওয়া জুয়া, অনলাইন জুয়া (Online Gambling) এবং অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিং বা মানি ট্রান্সফার রুখতেও আইনে সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তির ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
দেশে মাদকের ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশের প্রায় ৮২ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো অবৈধ মাদক ব্যবহারের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। অবৈধ মাদকের এই সর্বনাশা বিস্তারের কারণে দেশের তরুণ ও যুবসমাজের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মাদক পাচারকারী আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় চক্রগুলো এখন সাধারণ চ্যাট বা যোগাযোগের বাইরে গিয়ে ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অত্যন্ত উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর (Tech-Driven) কৌশল নির্ধারণ করছে, যা বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সংকট থেকে উত্তরণে কেবল বলপ্রয়োগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন:
“কেবলমাত্র কঠোর আইন প্রয়োগ বা পুলিশ পাঠিয়ে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না আমরা প্রতিটি পরিবার, সমাজ, স্কুল-কলেজ এবং পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ও ইস্পাতকঠিন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারব, ততক্ষণ এই অভিশাপ থেকে মুক্তি মেলা কঠিন। আমাদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে—তা দেখার দায়িত্ব পরিবারের।”
