দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অনবরত বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। অথচ এমন এক চরম যুদ্ধাংদেহী পরিস্থিতির মাঝেই আজ ২১ জুন (রোববার) সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘টেকনিক্যাল’ আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। গত শুক্রবার এই বৈঠক শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, লেবাননে আকস্মিক সহিংসতা বৃদ্ধির কারণে তা সাময়িকভাবে পিছিয়ে আজ রোববারে পুনঃনির্ধারণ করা হয়।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এবং দেশটির খিতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেছে—যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রথম শর্তটি ভঙ্গ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা থাকলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলা থামেনি।
তেহরানের স্পষ্ট অভিযোগ, ইসরায়েলের এই বেপরোয়া আচরণ এবং তাকে মার্কিন প্রশ্রয় দেওয়া মূলত যুদ্ধ অবসানের সমঝোতার পরিপন্থী। এরই জবাবে তারা আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে সকল প্রকার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং নৌযানগুলোকে এই জলসীমা থেকে দূরে থাকার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিলেও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক জলপথে নৌ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ রয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
- জাহাজ চলাচল: মাত্র গত শনিবারই (২০ জুন) ৫৫টি বিশাল বাণিজ্যিক ও মালবাহী জাহাজ অত্যন্ত নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
- জ্বালানি সরবরাহ: এই জাহাজগুলোর মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
- মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্য: সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইরানিরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে—এমন কোনো বাস্তব প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। আমরা দেখছি জাহাজগুলো নিয়মিত চলাচল করছে এবং যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে বলেই আমরা আশাবাদী।”
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকের আওতায় আগামী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদে হরমুজ প্রণালিতে কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক ট্রাফিক টোল আরোপ করা হবে না। তবে তিনি মার্কিন স্টাইলে এক নতুন হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন:
“যদি আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের সাথে চূড়ান্ত পারমাণবিক ও নিরাপত্তা চুক্তি ব্যর্থ হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমা সুরক্ষার দায়িত্ব এককভাবে মার্কিন নৌবাহিনীকে (Guardian Angel হিসেবে) নিতে হয়, তবে ভবিষ্যতে এই প্রণালি পারাপার হওয়া জাহাজের ওপর বিশেষ মার্কিন টোল (Tolls) আরোপের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।”
এই মেগা আলোচনায় অংশ নিতে শনিবার গভীর রাতে ওয়াশিংটনের যৌথ বিমানঘাঁটি অ্যান্ড্রুস থেকে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং আজ সকালে তিনি সেখানে পৌঁছান। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে তেহরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল, যার মধ্যে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন, ইতিমধ্যেই সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মূল নেপথ্য কারিগর বা মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান ও কাতার। রোববার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, আলোচনা সফল করতে এবং দুই দেশের বরফ গলাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির ইতিমধ্যেই সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। পাকিস্তানের শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এই আঞ্চলিক শান্তি আলোচনা কতটা গুরুত্ব বহন করছে।
