দীর্ঘ দুই বছর ধরে ঝুলতে থাকা এক স্পর্শকাতর ফৌজদারি মামলায় তেলেঙ্গানা পুলিশের দেওয়া সুনির্দিষ্ট চার্জশিটের (তদন্ত প্রতিবেদন) ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় চলচ্চিত্রের মেগাস্টার আল্লু অর্জুনকে চরম হুশিয়ারি দিয়েছেন হায়দরাবাদের একটি বিশেষ আদালত। নিজের সিনেমার স্ক্রিনিংয়ে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে এক নারী ভক্তের পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আগামী সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) সকালের মধ্যে আল্লু অর্জুনসহ মামলার ২০ জন অভিযুক্তকে জরুরি ভিত্তিতে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার সমন বা নোটিশ জারি করা হয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, এই সোমবার থেকেই ভারতের বহুল আলোচিত এই ট্র্যাজেডির আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া ও ট্রায়াল শুরু হতে যাচ্ছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন ও হায়দরাবাদ কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, এই মামলার চূড়ান্ত চার্জশিটে পুলিশ স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে যে, তারকাখ্যাতির দাপট দেখাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত বিগত ২০২৪ সালের শেষভাগে। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে একযোগে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল আল্লু অর্জুনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মেগা প্রজেক্ট ‘পুষ্পা টু: দ্য রুল’ (Pushpa 2: The Rule)। বিশ্বব্যাপী মুক্তির ঠিক আগের দিন অর্থাৎ ৪ ডিসেম্বর (২০২৪) রাতে হায়দরাবাদের বিখ্যাত ‘সন্ধ্যা থিয়েটারে’ (Sandhya Theater) সিনেমাটির একটি হাই-প্রোফাইল বিশেষ প্রিমিয়ার শো এবং রেড কার্পেট ইভেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল।
সেখানে প্রিয় তারকা আল্লু অর্জুনকে একনজর দেখার জন্য থিয়েটারের ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থাৎ হাজার হাজার উন্মাদের মতো ভক্ত ও সাধারণ মানুষ ভিড় জমান। তারকাকে সামনে পেয়ে ভিড়ের ভেতর হুড়োহুড়ি শুরু হলে রেবতী নামের এক দুর্ভাগ্যবতী নারী ভক্ত মাটিতে পড়ে যান এবং নির্মমভাবে পদদলিত হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এই একই ঘটনায় রেবতীর ৯ বছর বয়সী অবুঝ সন্তান তেজও হাড় ভেঙে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন আইসিইউতে (ICU) চিকিৎসাধীন ছিল।
এই চরম অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে মৃত্যুর দায়ে হায়দরাবাদ পুলিশ ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) অধীনে মামলা দায়ের করলে আল্লু অর্জুন, তাঁর ব্যক্তিগত মুখ্য ব্যবস্থাপক, স্টাফ, আটজন বাউন্সার এবং সন্ধ্যা থিয়েটারের মালিকসহ মোট ২০ জনকে আসামি করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর আল্লু অর্জুনকে পুলিশ নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করে। এক রাত লকআপে ও পুলিশ হেফাজতে কাটানোর পর তৎকালীন তেলেঙ্গানা হাই কোর্টের বিশেষ হস্তক্ষেপে শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন এই তারকা।
হায়দরাবাদ পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে সম্প্রতি স্থানীয় আদালতের বিচারকের কাছে এই মামলার অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল করেছে। তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, অভিনেতা আল্লু অর্জুন নিজে এবং তাঁর জনসংযোগ (PR) টিম সুনির্দিষ্টভাবে জানত যে—তিনি ওই রাতে প্রেক্ষাগৃহে সশরীরে সারপ্রাইজ ভিজিট দিতে আসবেন। এটি জানার পরও সন্ধ্যা থিয়েটার কর্তৃপক্ষ এবং অভিনেতার নিজস্ব সিকিউরিটি টিম সাধারণ দর্শকদের ঢেউ সামাল দিতে কোনো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বলয় বা ব্যারিকেড তৈরি করেনি।
তারকার বাউন্সাররা উল্টো লাঠিচার্জ করায় জনতা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে হন্যে হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয় রেবতী নামের ওই নারীকে। পুলিশ চার্জশিটে এই ঘটনাকে স্রেফ দুর্ঘটনা নয়, বরং ‘অবহেলার কারণে ঘটিত নরহত্যা’ ও মারাত্মক অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করার পরই আদালত ক্ষুব্ধ হয়ে সোমবারের মধ্যে আল্লু অর্জুনকে সশরীরে কাঠগড়ায় হাজির হওয়ার চূড়ান্ত ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছেন।
