ধ্বংসস্তূপের মাঝে নাবাতিয়াহ যেন নতুন কারবালা: ড্রোন ও বোমার আতঙ্কেই লেবাননে পালিত হলো অশ্রুসিক্ত আশুরা

৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের কারবালার সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি আর জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকী লড়াই যেন ২০২৬ সালের জুনে এসে নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ (Nabatieh) শহরে। দীর্ঘ সংঘাতের পর নাবাতিয়াহ আজ এক কার্যত ধ্বংসস্তূপের নগরী। কিন্তু বুক কাঁপানো ইসরাইলি গোলাবর্ষণ, মাথার ওপর চক্কর দেওয়া ঘাতক ড্রোন আর ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ির ইটের স্তূপের মাঝেই শত শত মানুষ বুক চাপড়ে মাতম তুললেন ‘হায় ইমাম হোসেন, দেখুন! এটাই কারবালার ট্র্যাজেডি।’

হিজবুল্লাহ-ইসরাইল যুদ্ধে লেবাননে এ পর্যন্ত হাজার ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের সিংহভাগই শিয়া মুসলিম। এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নাবাতিয়াহ শহরের এবারের আশুরা ছিল তাদের স্বজন হারানোর এক জীবন্ত শোকগাঁথা।

স্বাভাবিক সময়ে নাবাতিয়াহর বার্ষিক আশুরা অনুষ্ঠান পুরো শহরের গর্বের প্রতীক। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সমাগমে মুখরিত হতো রাস্তাঘাট। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ ১০০ দিনের যুদ্ধের পর গত ১৫ জুন (সোমবার) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত অপ্রত্যাশিত সমঝোতা স্মারক লেবানন যুদ্ধকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়। নাবাতিয়াহ শহর পুরোপুরি গ্রাস করার দ্বারপ্রান্তে থাকা ইসরাইলি বাহিনীর অগ্রযাত্রাও থমকে দাঁড়ায়।

যুদ্ধবিরতির এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শহরের সিভিল ডিফেন্স কর্মী ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতারাতি যুদ্ধের চিকিৎসা সরঞ্জাম নামিয়ে রেখে হাতে ঝাড়ু তুলে নেন। সাধারণত যে আশুরার প্রস্তুতি নিতে পুরো এক মাস সময় লাগে, এবার তারা সময় পেয়েছিলেন মাত্র দুই দিন। তারা কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বোমার ধ্বংসাবশেষ সরান এবং বিমান হামলায় সৃষ্ট দেয়ালের বড় বড় গর্তগুলো ঢাকতে কালো ব্যানার ও শোকের পোস্টার টাঙিয়ে দেন।

নাবাতিয়াহর অ্যাম্বুলেন্স সেবার প্রধান ৪৫ বছর বয়সী মেহদি সাদেক ইটিসি বাংলাকে বলেন:

“গতকাল রাতেও পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ছিল। প্রচুর গোলাবর্ষণ হয়েছে। আমরা সত্যিকারের একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চেয়েছিলাম, যাতে মানুষ তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসার ভরসা পায়। মূলত মানুষকে নাবাতিয়াহতে ফিরিয়ে আনার কারণ তৈরি করতেই আমরা ধ্বংসস্তূপের মাঝেই আশুরা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

এবারের আশুরায় নাবাতিয়াহ কেবল ইমাম হোসেনের জন্যই কাঁদেনি, কেঁদেছে তাদের সাম্প্রতিক নিহত সন্তানদের জন্যও। শহরের প্রতিটি দেয়ালে শোভা পাচ্ছিল হিজবুল্লাহর তরুণ শহীদদের পোস্টার। পাশের হারুফ গ্রামের প্রবেশমুখে ৩ মিটার উঁচু একটি বিশাল পোস্টারে দেখা যায় শুধু ওই গ্রামেরই নিহত ৫০ জন তরুণ যোদ্ধার ছবি। মিছিলে অংশ নেওয়া ৫০ বছর বয়সী বাসিন্দা ইসমাইল ইয়াঘি অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “এই যুদ্ধের পুরো সময় আমরা প্রতিদিন কারবালার যুদ্ধের নির্মম অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। আমাদের হৃদয়ে যেমন দুঃখ আছে, তেমনি শহীদদের জন্য গর্বও আছে।”

শোকযাত্রা চলাকালীনই আকাশের দিকে ইশারা করছিলেন অংশগ্রহণকারীরা। দূরে লেবাননের আকাশে তখন একটি ইসরাইলি ড্রোন চক্কর দিয়ে শোকের জমায়েতকে পর্যবেক্ষণ করছিল।

একদিকে যখন শোকযাত্রা চলছিল, অন্যদিকে সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা তখনো নিখোঁজদের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ ও মানবদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধারের কাজ করছিলেন। নাবাতিয়াহ অঞ্চলের সিভিল ডিফেন্স প্রধান হুসেইন ফাকিহ যখন ইটিসি বাংলার সাথে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই একটি ফোনকল আসে। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার মেয়ে মাত্র জানাল, ইসরাইলিদের সর্বশেষ হামলায় আমাদের নিজেদের বাড়িটিও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।”

১৫ জুনের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননের এই ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’-এ ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর একে অপরের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা অব্যাহত রয়েছে। শহরের প্রান্তের আলি তাহের পাহাড়ের ঠিক ওপারেই ওত পেতে আছে ইসরাইলি সেনারা। গত রাতের তীব্র সংঘর্ষে হিজবুল্লাহর হামলায় ৪ জন ইসরাইলি সেনা নিহত হলে, তার জবাবে ইসরাইল নাবাতিয়াহ ও আশপাশে নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এতে ১৮ জন সাধারণ মানুষ নিহত ও ৩৩ জন আহত হন। এই নতুন সহিংসতার আশঙ্কায় ফিরে আসা অনেক পরিবার আবারও নাবাতিয়াহ ছেড়ে বৈরুতের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *