ঠাকুরগাঁওয়ের একসময়ের সাধারণ সাইকেল মেকানিক সালমান আলীর উদ্ভাবিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এখন স্থানীয় মানুষের কাছে এক অনন্য উদাহরণ। নিজস্ব উদ্যোগ, পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে তিনি এমন একটি সোলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যা দিয়ে এলাকার উল্লেখযোগ্য অংশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের উদ্বোধন করতে গিয়ে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের মোলানী বাজারের চুনিহাড়ী পশ্চিমপাড়া এলাকায় সালমান আলীর উদ্ভাবিত সোলার প্যানেল প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
‘সাধারণ মানুষও অসাধারণ কাজ করতে পারেন’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রকৃতপক্ষে সালমান আলী একজন সাধারণ সাইকেল মেকানিক ছিলেন। নিজের পেশাগত কাজের পাশাপাশি তিনি নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই চিন্তা থেকেই তিনি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে সফলতা অর্জন করেন।
তিনি বলেন, একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও উদ্ভাবনী চিন্তা থাকলে সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। সালমান আলীর উদ্যোগ তারই বাস্তব উদাহরণ।
সৌরবিদ্যুতেই পূরণ হচ্ছে এলাকার চাহিদা
মির্জা ফখরুল জানান, সালমান আলীর লক্ষ্য ছিল এমন একটি সোলার ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা থেকে অধিক পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। বর্তমানে তার সেই উদ্যোগের মাধ্যমে এলাকার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আজ এখানকার মানুষের বিদ্যুতের প্রয়োজন অনেকটাই সোলার প্যানেলের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো এলাকার জন্য একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ।”
নীরবে কাজ করে গেছেন উদ্ভাবক
বিএনপির মহাসচিব বলেন, সালমান আলী কোনো প্রচারের আশায় কাজ করেননি। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নীরবে নিজের গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ চালিয়ে গেছেন।
তার ভাষায়, “তিনি ভেবেছেন কীভাবে নিজের উন্নতি করা যায়, একই সঙ্গে কীভাবে দেশের মানুষের উপকার করা যায়। সেই চিন্তা থেকেই তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। আজ তার সেই প্রচেষ্টার সুফল এলাকাবাসী ভোগ করছেন।”
তরুণদের উদ্দেশে বার্তা
অনুষ্ঠানে দেশের তরুণদের উদ্দেশে বিশেষ আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “আমি দেশের শিক্ষিত যুবসমাজকে বারবার বলি, নিজেরা কিছু করার চেষ্টা করুন। নতুন কিছু উদ্ভাবন করুন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখুন।”
তার মতে, সালমান আলীর মতো সাধারণ একজন মানুষও যদি নিজের প্রচেষ্টায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের সেবা করতে পারেন, তাহলে দেশের শিক্ষিত তরুণদের পক্ষেও আরও বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব।
সরকারি সহায়তার আশ্বাস
মির্জা ফখরুল জানান, সালমান আলীর মতো উদ্ভাবকদের পাশে সরকার থাকবে। তার এই প্রযুক্তিকে আরও বিস্তৃত পর্যায়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আরও বেশি সহযোগিতা করা হবে। তার এই উদ্যোগ যাতে আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করা যায় এবং দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বিকল্প জ্বালানিতে নতুন সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সালমান আলীর এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন শুধু বড় প্রতিষ্ঠান বা গবেষণাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ মানুষও নিজেদের প্রচেষ্টা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
স্থানীয়দের আশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে সালমান আলীর উদ্ভাবিত এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প আরও সম্প্রসারিত হবে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুরূপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথ তৈরি করবে।
