যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে এক তিব্বতি ব্যক্তি নিজের শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগ (NYPD)। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নির্বাসিত তিব্বতি সংগঠন ও বিভিন্ন গণমাধ্যম দাবি করেছে, তিব্বতের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রশ্নে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তিনি এই চরম প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে ৬টার দিকে জরুরি কল পাওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে পৌঁছে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে দ্রুত বেলভিউ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত নিহত ব্যক্তির পরিচয় কিংবা ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
নির্বাসিত তিব্বতি সংগঠনের দাবি
তবে নির্বাসিত তিব্বতিদের সংবাদমাধ্যম ভয়েস অব তিব্বত দাবি করেছে, নিহত ব্যক্তির নাম লোবগা রাংজেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে তিব্বতের স্বাধীনতা, জাতীয় ঐক্য এবং মানবাধিকারের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার পর নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন।
একই তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কয়েকটি স্থানীয় গণমাধ্যমও। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাংজেন ঘটনাস্থলে একটি তিব্বতি জাতীয় পতাকা বহন করছিলেন।
উবার চালক ছিলেন রাংজেন
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম amNewYork-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোবগা রাংজেন পেশায় একজন উবার চালক ছিলেন। নিউইয়র্কে বসবাসরত তিব্বতি সম্প্রদায়ের সদস্য এবং একই পেশায় কর্মরত লোবসাং পালজোর জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাংজেনকে চিনতেন।
তার দাবি, চীনের তিব্বত নীতি এবং তিব্বতি জনগণের ওপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে রাংজেন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তিব্বতের বাস্তবতা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
নতুন আইন নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক
ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটেছে, যখন চীনের নতুন ‘জাতিগত ঐক্য আইন’ কার্যকর হয়েছে। আইনটি নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
সমালোচকদের মতে, এই আইনের মাধ্যমে চীনের ৫৫টি স্বীকৃত জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।
তিব্বতি, উইঘুরসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এর ফলে তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয় এবং ঐতিহ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, চীনা সরকার বরাবরই বলে আসছে, জাতীয় ঐক্য সুসংহত করা এবং সব জনগোষ্ঠীর সমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই এই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
আত্মাহুতির ইতিহাস
তিব্বতের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আত্মাহুতির ঘটনা নতুন নয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৫০ জনেরও বেশি তিব্বতি আত্মাহুতির মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন।
এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা চীনের বাইরে বসবাসরত নির্বাসিত তিব্বতিদের মধ্যেও ঘটেছে বলে জানিয়েছে তিব্বতি অধিকারভিত্তিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বত।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার অধিকাংশই তিব্বতের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিব্বত প্রশ্নে দীর্ঘদিনের বিরোধ
১৯৫০ সালে চীন তিব্বতের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। বেইজিং এই ঘটনাকে “সামন্ততান্ত্রিক শাসন থেকে শান্তিপূর্ণ মুক্তি” হিসেবে বর্ণনা করে।
তবে তিব্বতি নির্বাসিত নেতৃত্ব, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং পশ্চিমা অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তিব্বতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে।
চীন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে, তিব্বতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মতে, ২০১২ সালে শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর তিব্বতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হয়েছে।
চীনা সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, কঠোর নজরদারি এবং বিধিনিষেধের কারণে সাধারণ মানুষের নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে।
শোক প্রকাশ
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বত-এর সভাপতি তেনচো গ্যাতসো এক বিবৃতিতে লোবগা রাংজেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, “তিনি তিব্বতের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। তার মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর বেদনার।”
তদন্ত অব্যাহত
এদিকে নিউইয়র্ক পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সব দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মাহুতির উদ্দেশ্য বা পেছনের কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হবে না।
তবে নির্বাসিত তিব্বতি সংগঠনগুলোর দাবি, এই ঘটনা তিব্বতের মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের একটি প্রতীকী প্রতিবাদ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার পর তিব্বত ইস্যু, চীনের জাতিগত নীতি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
