দুর্নীতির দায়ে দেশের আদালত কর্তৃক ক্রোক ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার স্পষ্ট নির্দেশনার পরও সাবেক স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্য, এস আলম গ্রুপ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদসহ বিগত আমলের সুবিধাভোগীদের স্থাবর সম্পত্তি নিজেদের জিম্মায় নিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিগত ২০২৫ সালে দেশ ও বিদেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশাল সম্পদ জব্দের ঐতিহাসিক আদেশ পেয়েছিল কমিশন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে সম্পদ বুঝে না পাওয়ায় এই দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের প্রকৃত সাফল্য ও কার্যকারিতা নিয়ে এখন তীব্র জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দুদকের অভ্যন্তরীণ গোপন নথি ও অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার ভিআইপি এলাকা গুলশান-২ এর ৭১ নম্বর রোডে অবস্থিত ‘ইস্টার্ন হারমোনি’ নামক একটি বিলাসবহুল চারতলা ভবনে একটি ফ্ল্যাটের মালিক সাবেক শেখ হাসিনার ভাগ্নি ও ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। বিগত ২০২৫ সালে দেশের আদালত এই ফ্ল্যাটটি সম্পূর্ণ জব্দের আদেশ দিলেও আজ পর্যন্ত সেখানে রিসিভার নিয়োগ বা ফ্ল্যাটের চাবি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি দুদক।
একই অবস্থা ঢাকার সেগুনবাগিচায় থাকা শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার নামে থাকা অপর একটি দামি ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রেও। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আদালত এই ফ্ল্যাটটি ক্রোকের স্পষ্ট নির্দেশ দেন। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে ২০编制৬ সালে এসেও রহস্যজনক কারণে সেই ফ্ল্যাটটি বুঝে নিতে পারেনি দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি।
দুদকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আদালতের আদেশে দেশের অভ্যন্তরে থাকা ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মধ্যে ৬ হাজার ১৩৭ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের স্থাবর (জমি, ফ্ল্যাট ও বাড়ি) সম্পদ জব্দ করা হয়। তবে এই বিপুল ও আকাশচুম্বী সম্পদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই কোনো রিসিভার বা সরকারি তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। আর নামমাত্র কিছু সম্পত্তিতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে রিসিভার নিয়োগ করা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি।
রিসিভার নিয়োগ না হওয়ার সুবাদে এসব ফ্ল্যাট থেকে আসা মাসিক লাখ লাখ টাকার ভাড়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ কিংবা কৃষিজমির আয় এখনো ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে গিয়ে নগদ টাকার মাধ্যমে মূল অভিযুক্ত বা তাদের প্রতিনিধিরাই হাতিয়ে নিচ্ছেন। কাগজের ক্রোক আদেশকে একপ্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আড়ালে সম্পদের পূর্ণ সুবিধা ভোগ করছেন তারা।
সম্পদ বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের নানা সীমাবদ্ধতা ও লোকবল সংকটের কথা স্বীকার করে দুদকের সিনিয়র আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম ইটিসি বাংলাকে বলেন:
“মাঠপর্যায়ে এই বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি বুঝে নিতে না পারার প্রধানতম কারণ হচ্ছে দুদকের তীব্র লোকবলের অভাব। তাছাড়া সাধারণ ফৌজদারি মামলার সাথে দুদকের এসব আর্থিক অপরাধের মামলার অনেক তফাত রয়েছে। বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মূল দলিল বা কাগজপত্র সংগ্রহ, ব্যাংকে ব্যাংকে তথ্য যাচাই-বাছাই করতে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। জনগণের আশানুরূপ গতিতে না হলেও কমিশন কিন্তু বসে নেই, কাজ চলছে।”
তবে লোকবল সংকটের এই অজুহাতকে স্রেফ ফাঁকিবাজি ও দুদকের সদিচ্ছার চরম অভাব হিসেবে দেখছেন সংস্থাটির সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম। দুদকের এই ব্যর্থতার পেছনে চরম গাফিলতি ও আন্তরিকতার ঘাটতিকে দায়ী করে ইটিসি বাংলাকে তিনি বলেন:
“আইন অনুযায়ী কোনো অবৈধ সম্পদ যদি আয় যোগ্য (যেমন ফ্ল্যাট ভাড়া বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান) হয়, তাহলে আদালতের আদেশের পরপরই সেই আয়টা রিসিভারের রাষ্ট্রীয় তহবিলে আসার কথা। আর এই কাজটা করার জন্য প্রথমত কনজিউমার বা প্রধান পক্ষ হিসেবে দুদককেই আদালতে রিসিভার নিয়োগের জন্য আনুষ্ঠানিক দরখাস্ত দিতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে গিয়ে দখল নিতে হবে। দুদক সময়মতো এই কাজটি করে না বলেই এখনো যার অবৈধ সম্পদ, আড়ালে তিনিই তা বুক ফুলিয়ে ভোগ করছেন।”
অবশ্য এই চরম ব্যর্থতার মাঝেও সাবেক বিতর্কিত আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ বেশ কয়েকজন চিহ্নিত প্রভাবশালী ব্যক্তির কয়েকশ কোটি টাকার সম্পত্তিতে সঠিক সময়ে রিসিভার নিয়োগ করা সম্ভব হয়েছিল এবং সেই কৃষি খামার ও ফ্ল্যাট থেকে অর্জিত অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
