বন্যা ও ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়ে গেলেও তিস্তার স্থায়ী সমাধান এখনো শুধু আশ্বাসের পাতায় বন্দি। কোনো ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার অজুহাত না দেখিয়ে, প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রংপুর।
গতকাল বুধবার (১৭ জুন, ২০২৬) সন্ধ্যায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক বিশাল গণসমাবেশ ও মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। তিস্তাপাড়ের হাজার হাজার মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। সমাবেশ শেষে একটি বিশাল মশাল মিছিল বের করা হয়, যা মহিপুর ও তিস্তাপাড়ের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। এ সময় অংশগ্রহণকারীদের ক্ষুব্ধ স্লোগানে তিস্তার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
গণসমাবেশে বক্তব্য দেন তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী, সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমানসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
বক্তারা বলেন, তিস্তা এখন উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং বঞ্চনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবন এক নির্মম বৈপরীত্যের মধ্যে কাটে:
- বর্ষা মৌসুম: নদীর উন্মত্ত স্রোত ও আকস্মিক বন্যা ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং শেষ সম্বল ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
- শুষ্ক মৌসুম: পানির অভাবে মরুভূমিতে রূপ নেয় নদী, ফলে কৃষি উৎপাদন ও সেচ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এই দুঃসহ পরিস্থিতির স্থায়ী অবসান ঘটাতে তিস্তা অববাহিকার মানুষ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর মহাপরিকল্পনার (Teesta Mega Plan) পথ চেয়ে বসে আছেন।
সমাবেশে অংশ নেওয়া নদীপাড়ের ভুক্তভোগী মানুষরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি মৌখিকভাবে আলোচনায় এলেও, এর বিপরীতে কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ কিংবা এটি বাস্তবায়নের সময়সূচি (Timeline) উল্লেখ করা হয়নি। বাজেটের এই উদাসীনতা নদীপাড়ের মানুষকে নতুন করে চরম হতাশায় ফেলেছে। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এখন আর কোনো ফাঁকা আশ্বাস নয়, রাজপথে দৃশ্যমান কাজের সূচনা ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা দেখতে চান।
সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সরকারকে প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
“তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করার সুযোগ নেই। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে প্রকল্প শুরু করতে হবে। আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—গত বছর তিস্তাপাড়ের লাগাতার আন্দোলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বর্তমান সরকারপ্রধান নিজে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছিলেন। তাই আমরা আশা করি, তারেক রহমান সরকারের হাত ধরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ দ্রুত দৃশ্যমান হবে।”
সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, উত্তরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের দুর্ভোগ বারবার শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয়বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এবার যদি চলতি বাজেট অধিবেশনে তিস্তার জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট কোড ও রোডম্যাপ ঘোষণা করা না হয়, তবে ঢাকামুখী লংমার্চসহ আরও কঠোর ও লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
