বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই প্রায় প্রতিদিন যে নির্মম বাস্তবতা আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, তা হলো নারী ও শিশুদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ বা দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর নৃসংশভাবে হত্যার মতো ঘটনাগুলো জনমনে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং তীব্র নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত কঠোর আইন, এত আন্দোলন এবং এত সামাজিক প্রতিবাদের পরও কেন এই অপরাধের বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে? কোথায় গলদ?
মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্যগুলো আমাদের মোটেও কোনো আশার আলো দেখাচ্ছে না, বরং এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করছে।
- আসক (ASK)-এর গা শিউরে ওঠা তথ্য: দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মাত্র ৫ মাসেই অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া ৪৬ জন শিশু চরম ধর্ষণচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছে।
- মৃত্যু ও আত্মহত্যার মিছিল: এই পাঁচ মাসে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর অন্তত ১৪ জন শিশু নির্মমভাবে নিহত হয়েছে এবং ধর্ষণের ব্যর্থ চেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে। লোকলজ্জা আর মানসিক ট্রমা সইতে না পেরে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর অন্তত ২ জন নিষ্পাপ শিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
- মহিলা পরিষদের উদ্বেগ: অন্যদিকে, ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’-এর বিগত ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছর দেশে ধর্ষণের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বিশাল ও প্রধান অংশই ছিল অবুঝ শিশু।
এই তথ্যগুলো রাষ্ট্রের সামনে একটি চরম ও কুৎসিত সত্য তুলে ধরে—আমাদের সমাজে আজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সেই নিষ্পাপ শিশুরা, যাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক ও মৌলিক দায়িত্ব ছিল পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিশু ইরা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কিংবা এর আগে মাগুরার বহুল আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ মামলার মতো ঘটনাগুলো কেবল সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। এগুলো সমাজে শিকড় গেড়ে বসা ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ বা কালচার অব ইম্পিউনিটি (Culture of Impunity)-র চাক্ষুষ প্রতিফলন। এগুলো রাষ্ট্রের সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার এক চরম সংকটকে প্রকাশ করে। যখন একজন অপরাধী মনে করে যে, অপরাধ করার পর রাজনৈতিক বা পেশীশক্তি খাটিয়ে পার পাওয়া সম্ভব কিংবা দেশের বিচার পেতে বছরের পর বছর লেগে যাবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার অপরাধ প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
ধর্ষণের এই মহামারি আকারের বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বিচারহীনতা। আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংক্রান্ত হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ধরে দেশের আদালতগুলোতে ঝুলে আছে। যদিও আইনে স্পষ্ট করে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার (১৮০ দিন) মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া আছে, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর, এমনকি দশক পার হয়ে যায়।
দীর্ঘায়িত এই বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যগ্রহণের জটিলতা এবং দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ব্যবস্থার কারণে অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় একদম উবে গেছে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো শুধু গভীর মানসিক আঘাত ও সামাজিক লাঞ্ছনার শিকারই হচ্ছে না, বরং দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্রমশ ধসে পড়ছে। অথচ, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের (CRC) অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শিশুদের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন এবং শোষণ প্রতিরোধ করতে আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনত সম্পূর্ণ বাধ্য।
একটি ধর্ষণের ঘটনা কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি রাষ্ট্র ও জাতীয় সংকট। প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা শুধু একটি নিষ্পাপ জীবনের আলোকেই নিভিয়ে দেয় না, বরং রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও মানবিক মূল্যবোধকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। এই প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন তাঁর একটি মামলার পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত চমৎকার ও হৃদয়স্পর্শী কথা বলেছেন:
“শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো শিশু এ ধরনের জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে।”
এই পঙ্কিল পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে আমাদের শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষণিকের প্রতিবাদ জানালে চলবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ এবং দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান বিচার। উত্তরণের জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি: ১. ফাস্ট ট্র্যাককোর্ট ও দ্রুত বিচার: বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে শিশু ধর্ষণের মামলাগুলো কোনো কালক্ষেপণ ছাড়াই দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তি কার্যকর করতে হবে। ২. সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা: মামলার প্রধান বাধা হলো সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো। তাই ভুক্তভোগী শিশু ও সাক্ষীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শতভাগ আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে। ৩. যৌন সচেতনতামূলক শিক্ষা: দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন সহিংসতা প্রতিরোধমূলক শিক্ষা’ এবং গুড টাচ-ব্যাড টাচ ও ‘সম্মতি’ (Consent) বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ৪. আইনের কঠোর প্রয়োগ: বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা আইনগুলোর কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায়, আমরা শুধু প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নির্মম ঘটনার সংবাদই পড়ে যাব, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান কখনোই দেখতে পাব না। আমাদের মনে রাখতে হবে—শিশু সুরক্ষা কেবল কাগজে-কলমে থাকা কোনো নীতিগত প্রতিশ্রুতি নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব, মৌলিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা এবং একটি সভ্য সমাজের টিকে থাকার মূল ভিত্তি।
