কয়েক বছর আগে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের ভেতরের ছবি ছাপা হয়েছিল। ছবিতে দেখা গিয়েছিল, একটি হলের গণরুমে গাদাগাদি করে শুয়ে-বসে আছে একঝাঁক তরুণ। কিন্তু সেই ছবির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও করুণ দিকটি ছিল—এতগুলো চঞ্চল তরুণ এক রুমে একসঙ্গে থাকা সত্ত্বেও কেউ কারও সাথে কোনো কথা বলছে না, কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেও না। সবার চোখ ও মনোযোগ স্থির হয়ে আছে নিজ নিজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে!
এই একটি ছবিই মূলত আমাদের বর্তমান সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের এক রূঢ় ও নগ্ন বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। আমরা মুখে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বললেও, এটি আসলে আমাদের তরুণদের দিন দিন আরও বেশি ‘অসামাজিক’ ও সমাজবিচ্ছিন্ন করে তুলছে। শুধু অসামাজিক করাই নয়, এই আসক্তি এখন বিশ্বজুড়ে এক গভীর শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় বা ‘ভার্চুয়াল প্লেগ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
অতীতে ‘আসক্তি’ বা ‘নেশা’ শব্দটি কেবল হিরোইন, গাঁজা, মদ, ফেনসিডিল বা সিগারেটের মতো মারাত্মক মাদকের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো। সেসব নেশা মানুষ সমাজ ও পরিবারের ভয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে করত। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির ছদ্মবেশে আমাদের চোখের সামনে, ড্রয়িংরুমে কিংবা রিডিং টেবিলে যে নতুন নেশা হানা দিয়েছে, তা হলো—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অন্ধকার এক ভার্চুয়াল জগৎ।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুই যে বিষ, তা আমরা ভুলে গেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অগণিত ভালো দিক এবং কোটি মানুষের উপকারের খতিয়ান থাকলেও, এর অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে যাওয়া, স্ক্রল করা ছাড়তে না পারা, ইন্টারনেট না থাকলে খিটখিটে বা ক্রুদ্ধ হয়ে যাওয়া এবং খাওয়া-ঘুমা-ব্যায়ামের রুটিন লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া এই ডিজিটাল মাদকেরই প্রাথমিক লক্ষণ।
ভার্চুয়াল জগতের আগের পৃথিবীটা ছিল বাস্তব। মানুষের সম্পর্ক তৈরি হতো মুখোমুখি কথায়, চোখের দেখায়, মান-অভিমানে আর সুখ-দুঃখের ভাগাভাগিতে। কিন্তু বর্তমানের এই কৃত্রিম জগৎ আমাদের এক পরম বিভ্রমের সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
আজকের বাস্তবতার এক চরম পরিহাস হলো—পাশের ঘরে হয়তো জন্মদাত্রী মা তীব্র অসুস্থতায় ও যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, আর সন্তান পাশের রুমে বসে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে ‘মা দিবস’ নিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেওয়ায় ব্যস্ত! বাস্তবের মায়ের চেয়ে তার কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘ভার্চুয়াল মা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ সেই স্ট্যাটাসে লাইক আসবে, কমেন্টস আসবে, আর সে মনের সুখে বারবার নোটিফিকেশন চেক করবে। পাশের ঘরের মায়ের সেবা করার সময় তার কোথায়? এই অলীক সুখের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সত্যিকারের স্বজন, নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, একজন মার্কিন নাগরিক দিনে গড়ে অন্তত ৩৪৪ বার তাঁর স্মার্টফোন বা স্মার্ট ডিভাইস চেক করেন। আমাদের দেশের চিত্রও এর চেয়ে ভিন্ন নয়। তরুণদের একটি বড় অংশ রাতে ঘুমানোর সময়ও ফোন বালিশের পাশে বা হাতে নিয়ে যান এবং রাতভর স্ট্যাটাস বা রিলসের আপডেট চেক করেন।
এর ফলে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে জরুরি উপাদান ‘নিরবচ্ছিন্ন ঘুম’ বিঘ্নিত হচ্ছে। যার চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিচ্ছে তীব্র মানসিক অবসাদ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, নার্ভাসনেস, ক্রোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সাইকোলজিক্যাল সমস্যা। মার্কিন গবেষকদের মতে, সুস্থ ও শান্তিময় ঘুমের জন্য প্রতিদিন স্মার্ট ডিভাইসের সার্বিক ব্যবহার সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখা উচিত।
বাস্তব জীবনে আমরা সত্যটাকে যেমন, তেমনই দেখি। কিন্তু ভার্চুয়াল জগৎ সবকিছু আমাদের সামনে উপস্থাপন করে নিখুঁত ও ফিল্টার করা সৌন্দর্যের চাদরে মোড়কে। এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কৃত্রিম রূপ দেখে তরুণ-তরুণীদের নিজস্ব আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এক বৈশ্বিক জরিপ বলছে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণী এবং ১৪ শতাংশ তরুণ নিজেদের শারীরিক গঠন ও সৌন্দর্য নিয়ে তীব্র হীনম্মন্যতা ও মানসিক গ্লানিতে ভোগেন।
এর চেয়েও অন্ধকার দিক হলো—এই ভার্চুয়াল জগতে প্রেম বা বন্ধুত্বের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের। নতুন নতুন সাইবার আইন করেও এই অপরাধ চক্রকে থামানো যাচ্ছে না। তদুপরি, বাস্তব জগতের বুলিংয়ের চেয়ে ‘সাইবার বুলিং’ (Cyber Bullying) বহুগুণে মারাত্মক। বাস্তবের ঝগড়া বা গালি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকে এসে আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু সাইবার স্পেসের ট্রল বা বুলিং ইন্টারনেটের দেওয়ালে স্থায়ীভাবে থেকে যায় এবং মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়, যা একজন তরুণের মনস্তত্ত্বকে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়। এই চাপ নিতে না পেরে অনেক সম্ভাবনাময় প্রাণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতেও দ্বিধা করছে না।
মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ এই তরুণ প্রজন্মকে আমরা এভাবে একটি কৃত্রিম স্ক্রিনের হাতে সঁপে দিয়ে শুধু আফসোস করতে পারি না। কোনো সচেতন অভিভাবক নিশ্চয়ই তাঁর সন্তানকে হিরোইন বা কোকেন সেবন করতে দেবেন না; অথচ স্মার্ট ডিভাইস কিন্তু মানসিক ক্ষতির বিচারে হিরোইনের চেয়ে কম নয়।
তবে মনে রাখতে হবে, একজন মাদকাসক্তের হাত থেকে হুট করে মাদক কেড়ে নিলেই যেমন সে সুস্থ হয় না, তেমনি সন্তানের হাত থেকে হঠাৎ ফোন কেড়ে নিলেই এই আসক্তি দূর হবে না। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ:
- স্ক্রিন টাইম ম্যানেজমেন্ট: সন্তানের স্ক্রিন টাইম (Screen Time) হুট করে ৮ ঘণ্টা থেকে শূন্যে নামানো যাবে না। তাকে ভালোবেসে বুঝিয়ে আস্তে আস্তে এই সময় কমিয়ে আনার অভ্যাস করাতে হবে।
- ভালোবাসা ও প্রশংসা: সন্তানকে প্রতিনিয়ত বোঝাতে হবে সে বাস্তবে কত সুন্দর, তার মধ্যে কী অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। সমস্যা থেকে পালিয়ে ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নেওয়া নয়, বরং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা শেখাতে হবে।
- বাস্তব বিনোদনের সুযোগ: সন্তানকে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ের বদলে খেলার মাঠ, বই পড়া, প্রকৃতি দেখা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেবল ইতিবাচক ও শিক্ষণীয় কাজে ব্যবহার করার দীক্ষা দিতে হবে।
