বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা পেরিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে জয়ের পরও ম্যাচটি নিয়ে স্বস্তির পাশাপাশি আবেগ প্রকাশ করেছেন দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি। জাতীয় দলের দায়িত্বে নিজের ১০০তম ম্যাচকে তিনি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী এবং স্মরণীয় ম্যাচ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শনিবার (৪ জুলাই) মিয়ামি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে দুই দল সমতায় থাকায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা নিশ্চিত করে শেষ ষোলোর টিকিট।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্ক্যালোনি বলেন, এই জয় যতটা আনন্দের, তার চেয়েও বেশি স্বস্তির। কারণ কেপ ভার্দে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলেছে এবং আর্জেন্টিনাকে পুরো ম্যাচজুড়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
তিনি বলেন, “এই দল কখনও হাল ছেড়ে দেয় না। আমার জাতীয় দলের কোচ হিসেবে ১০০তম ম্যাচে যদি আমরা বিদায় নিতাম, সেটি আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টের হতো। তবে ফুটবল এমনই একটি খেলা, যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়।”
কেপ ভার্দের প্রশংসা করে স্ক্যালোনি বলেন, বিশ্বকাপে কোনো প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। অনেকেই ধারণা করেছিলেন আর্জেন্টিনা তুলনামূলক সহজ ড্র পেয়েছে, কিন্তু এই ম্যাচ সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে।
তার ভাষায়, “সবসময় ইতিবাচক বিষয়গুলো দেখতে হবে। প্রতিপক্ষকে আমি অভিনন্দন জানাই। সবাই বলে বিশ্বকাপে সহজ কোনো দল নেই, আজ কেপ ভার্দে সেটিই প্রমাণ করেছে। তারা অত্যন্ত সংগঠিত ও সাহসী ফুটবল খেলেছে।”
দলের মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করে আর্জেন্টিনার এই কোচ বলেন, প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “সবাই নিজের দায়িত্ব পালন করেছে। সবাই মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। এটাই আর্জেন্টিনার পরিচয়। আমরা জানতাম ম্যাচটি সহজ হবে না। তবে কঠিন মুহূর্তেও দল বিশ্বাস হারায়নি।”
নিজের ১০০তম ম্যাচের প্রসঙ্গে স্ক্যালোনি বলেন, জাতীয় দলের কোচ হিসেবে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনা করলেও কেপ ভার্দের বিপক্ষে এই ম্যাচ তাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে।
তিনি বলেন, “১০০টি ম্যাচের মধ্যে সম্ভবত এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। কারণ এটি বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ এবং এখানে একটি ভুলই পুরো যাত্রা শেষ করে দিতে পারত।”
ম্যাচ বিশ্লেষণে তিনি আরও বলেন, আর্জেন্টিনা জয়ের যোগ্য ছিল, তবে প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ছিল অসাধারণ। দলের কিছু ভুল থাকলেও সেগুলো নিয়ে পরে বিশ্লেষণ করা হবে।
স্ক্যালোনির ভাষায়, “আমরা অনেক আক্রমণ করেছি, বলের দখল ধরে রেখেছি এবং সুযোগও তৈরি করেছি। কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছে, তবে সেগুলো আমরা বিশ্লেষণ করব। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দল শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে এবং জয় ছিনিয়ে এনেছে।”
অতিরিক্ত সময় খেলার কারণে ফুটবলারদের শারীরিক ক্লান্তির বিষয়েও কথা বলেন আর্জেন্টিনা কোচ। তিনি জানান, মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা এনজো ফার্নান্দেজ ম্যাচের শেষদিকে পেশির সমস্যায় পড়লেও তখন আর পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না।
তিনি বলেন, “অতিরিক্ত সময়ের কারণেই খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। এমন সময় শুধু শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক দৃঢ়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নামলে সেই মানসিক শক্তিই খেলোয়াড়দের বাড়তি অনুপ্রেরণা দেয়।”
দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দের হয়ে সিডনি লোপেসের অসাধারণ সমতাসূচক গোল নিয়েও মন্তব্য করেন স্ক্যালোনি। তিনি বলেন, সেই গোলটি ঠেকানো প্রায় অসম্ভব ছিল।
“আমরা জানতাম সে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ে শট নিতে পছন্দ করে। কিন্তু যেভাবে বলটি গোলমুখে পাঠিয়েছে, সেটি সত্যিই অসাধারণ ছিল। এমন শট আটকানো খুব কঠিন।”
ম্যাচ চলাকালে কোনো সময় বিদায়ের শঙ্কা অনুভব করেছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে স্ক্যালোনি বলেন, ফুটবলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে হয়।
তিনি বলেন, “আমি কখনও ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিন্ত হই না। অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত সবকিছু সম্ভব। আমরা আধিপত্য করেছি, কিন্তু ফল অন্যরকমও হতে পারত।”
লাউতারো মার্টিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজ ও লিওনেল মেসিকে একসঙ্গে খেলানোর সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন তিনি। স্ক্যালোনির মতে, কোচের প্রধান কাজ হলো দলের ভারসাম্য বজায় রাখা।
তিনি বলেন, “মেসি, লাউতারো এবং হুলিয়ান—তিনজনই অসাধারণ ফুটবলার। তবে সবাইকে একসঙ্গে খেলানো সবসময় সহজ নয়। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী তা হতে পারে, কিন্তু এই ম্যাচে আমরা ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছিলাম।”
২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের সঙ্গে কেপ ভার্দে ম্যাচের তুলনা করে স্ক্যালোনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতা দলকে আরও পরিণত করেছে।
তিনি বলেন, “আজকের আর্জেন্টিনা অনেক বেশি অভিজ্ঞ। খেলোয়াড়রা জানে কীভাবে চাপ সামলাতে হয়। সৌদি আরবের ম্যাচে আমরা নিজেদের সেরা ছন্দে ছিলাম না। কিন্তু আজ দল কঠিন পরিস্থিতিতেও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।”
শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত হলেও সামনে আরও কঠিন লড়াই অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন স্ক্যালোনি। তবে তার বিশ্বাস, এই ম্যাচে দলের যে মানসিক দৃঢ়তা ও লড়াইয়ের মনোভাব দেখা গেছে, সেটিই পরবর্তী পর্বে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
