ডিজিটাল রূপান্তর, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংযোগ সক্ষমতায় নতুন ইতিহাস গড়েছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) উন্নয়নসূচকে বিশ্বের ১৫৯টি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে দেশটি। এই অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে নিজেদের নেতৃত্বের অবস্থান আরও শক্তিশালী করলো সৌদি আরব।
আইটিইউর প্রকাশিত এই সূচকে বিভিন্ন দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রগতি, ডিজিটাল সংযোগ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং সেবার মান মূল্যায়ন করা হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংযোগ (Universal Connectivity) এবং কার্যকর সংযোগ (Meaningful Connectivity)—এই দুটি সূচককে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি কমিশন (সিআইটিসি) জানায়, এই সাফল্য দেশের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের গৃহীত নীতির বাস্তব প্রতিফলন। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অঙ্গনে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও সক্ষমতারও স্বীকৃতি।
সিআইটিসির ভাষ্য অনুযায়ী, উন্নত নিয়ন্ত্রক কাঠামো, প্রযুক্তিবান্ধব নীতিমালা, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া ধারাবাহিক উদ্যোগ দেশটিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে। এসব উদ্যোগের ফলে প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সৌদি আরবের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বাজারের আকার ১৯৯ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালে পৌঁছেছে। গত পাঁচ বছরে এ খাতের চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (CAGR) ছিল প্রায় ৮ শতাংশ, যা দেশটির প্রযুক্তি খাতের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রমাণ বহন করে।
এর ফলে সৌদি আরব বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি বাজার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।
ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রেও দেশটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সিআইটিসির তথ্যমতে, সৌদি আরবে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ১০০ শতাংশ, একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের মালিকানার হারও ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ কার্যত দেশের প্রতিটি নাগরিকই ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
এ ছাড়া দেশটিতে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ১৫১ এমবিপিএস এবং মোবাইল ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ২১৬ এমবিপিএস, যা বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও দ্রুতগতির ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিচায়ক।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সৌদি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এ সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, স্মার্ট সিটি, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সরকারি সেবা উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগের সুফল এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি অবকাঠামো শক্তিশালী হওয়ার ফলে শুধু নাগরিক সেবাই নয়, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সেবা এবং সরকারি কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সিআইটিসি আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও উদ্ভাবন, গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব ধরে রাখতে কাজ করবে সৌদি আরব। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল রূপান্তরের প্রতিযোগিতায় এই অর্জন সৌদি আরবের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইটিইউর ২০২৬ সালের আইসিটি উন্নয়নসূচকে শীর্ষস্থান অর্জন শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার স্বীকৃতিই নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের পথে দেশটির অগ্রযাত্রারও প্রতিফলন।
