ভয়াবহ ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় মৃত্যু ১,৪৩০ ছাড়াল, চলছে মরিয়া উদ্ধার অভিযান

ক্যারিবীয় উপকূলবর্তী দেশ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ ততই ফুরিয়ে আসছে। তবে এই চরম হতাশা ও লাশের মিছিলেও কিছু অলৌকিক বেঁচে ফেরার গল্প আশার আলো জাগাচ্ছে। মূল ভূমিকম্প আঘাত হানার পর প্রায় ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকাদের উদ্ধারে দিনরাত এক করে লড়ছেন দেশি ও বিদেশি উদ্ধারকর্মীরা।

৭২ ঘণ্টা পর অলৌকিক উদ্ধার, পাশে স্বজনদের আহাজারি

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর উপকূলের লা গুয়াইরা (La Guaira) অঙ্গরাজ্যে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে স্থানীয় সময় শনিবার এক অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হন উদ্ধারকর্মীরা। স্পেনের মিলিটারি ইমার্জেন্সি ইউনিটের (UME) একটি চৌকস দল প্রায় ৭২ ঘণ্টা কংক্রিটের ভারী স্ল্যাবের নিচে আটকে থাকা এক বৃদ্ধাকে সম্পূর্ণ অলৌকিক ও জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

এর আগে একই এলাকার অন্য একটি ধসে পড়া বহুতল ভবন থেকে এক নবজাতক ও তার মাকে জীবন্ত উদ্ধার করা হয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার একটি বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল ১১ বছর বয়সী এক কিশোরকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনে। তবে এমন দু-একটি আনন্দের খবরের চেয়ে স্বজন হারানোর আর্তনাদই এখন ভারী করে তুলেছে ভেনেজুয়েলার বাতাস। হাজার হাজার পরিবার এখনও তাদের নিখোঁজ প্রিয়জনদের জীবিত বা মৃত এক নজর দেখার আশায় ধ্বংসস্তূপের পাশে অশ্রুসজল চোখে অপেক্ষা করছেন।

৪৩০টি আফটারশক ও ভারী যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট

ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, দেশের এই চরম জাতীয় দুর্যোগের মুহূর্তে সাড়া দিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় এগিয়ে এসেছে। উদ্ধার অভিযানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে ইতালি, ব্রাজিল এবং স্পেন থেকে এরই মধ্যে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি অভিজ্ঞ বিদেশি ফায়ার ফাইটার ও উদ্ধারকর্মী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছেছেন।

তবে লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে অন্তত ১০০টি বহুতল ভবন পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে যাওয়ায় এবং কংক্রিট সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় ভারী ক্রেন ও এক্সকাভেটর বা যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট থাকায় উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উপদ্রুত এলাকায় সাধারণ মানুষের ভিড় ও ট্রাফিক জ্যাম রুখতে এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত জোনে জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ সীমিত করেছে প্রশাসন। উল্লেখ্য, মূল শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের পর ওই অঞ্চলে আরও ৪৩০টিরও বেশি পরাঘাত (Aftershock) রেকর্ড করা হয়েছে, যা উদ্ধারকর্মীদের সুরক্ষাকেও চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

বিপর্যস্ত কারাকাস: ৬৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় আইওএম (IOM)

ভেনেজুয়েলা সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতর জানিয়েছে, লা গুয়াইরা অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৬০ শতাংশ জরুরি ভিত্তিতে পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। কলম্বিয়া, কোস্টারিকাসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানযোগে খাদ্য ও জরুরি ওষুধসহ ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করেছে।

তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) এক বৈশ্বিক বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে:

  • সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত: ভেনেজুয়েলার এই মহাবিপর্যয়ে দেশটির প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
  • জরুরি মানবিক সংকট: রাজধানী কারাকাসসহ (Caracas) বিস্তীর্ণ উপদ্রুত এলাকায় লাখ লাখ মানুষের জন্য জরুরি অস্থায়ী আশ্রয়স্থল, বিশুদ্ধ সুপেয় পানি, ফিল্ড হসপিটাল, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং শিশুখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
  • দীর্ঘ পুনর্বাসন: আইওএম-এর মতে, তাৎক্ষণিক এই উদ্ধার অভিযান ও লাশ উদ্ধারের প্রক্রিয়া আগামী কয়েক দিনে শেষ হলেও, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ভেনেজুয়েলাবাসীর সামনে আগামী এক দশক অপেক্ষা করছে দীর্ঘ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের এক অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *