ছয় মাসে ৭০০ বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে

মিয়ানমারে গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষের ওপর জান্তা বাহিনীর নিষ্ঠুর বিমান হামলা ও কামানের গোলাবর্ষণ চরমে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ও অকাট্য তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন নিষ্পাপ শিশু রয়েছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ফাইটার জেট থেকে চালানো নির্বিচার বিমান হামলাই ছিল দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক দুর্ভোগের প্রধান কারণ। বর্তমানে দেশটির ‘সাগাইং’ (Sagaing) অঞ্চলকে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেবল এই এক অঞ্চলেই জান্তার হামলায় অন্তত ১৯১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬০ জন নারী ও ৩০ জন শিশু রয়েছে। প্রতিবেদনে সাগাইংয়ের দুটি সুনির্দিষ্ট বর্বরোচিত হামলার কথা উল্লেখ করা হয়: ১. স্কুলের সামনে গোলাবর্ষণ: গত অক্টোবর মাসে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্থানীয় স্কুলের সামনে সাধারণ মানুষ জড়ো হলে তাদের ওপর আকস্মিক ও নৃশংস গোলাবর্ষণ করে জান্তা সেনা। এতে ঘটনাস্থলেই চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। ২. ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় বিমান হামলা: গত ডিসেম্বর মাসে সাগাইংয়ের তাবায়িন এলাকায় একটি স্থানীয় চায়ের দোকানে বসে যখন সাধারণ মানুষ টেলিভিশনে ফুটবল ম্যাচ দেখছিলেন, ঠিক তখনই জান্তার যুদ্ধবিমান থেকে সেখানে বোমা ফেলা হয়। এই হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত এবং আরও ২০ জন ছিন্নভিন্ন হয়ে আহত হন।

মিয়ানমারের চলমান এই গৃহযুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান তীব্র নির্যাতনের চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বর্তমানে রোহিঙ্গারা একদিকে যেমন জান্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু, অন্যদিকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’ (Arakan Army)-র মাধ্যমেও তারা ব্যাপক জোরপূর্বক যুদ্ধ-নিয়োগ, ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং ভয়াবহ যৌন সহিংসতার (Sexual Violence) শিকার হচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক (Volker Türk) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চরম নিষ্ক্রিয়তায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন:

“মিয়ানমারের নিরীহ জনগণ সামরিক বাহিনীর বুটের নিচে দীর্ঘদিন ধরে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এখন অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো—জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও যেন মিয়ানমারের এই চরম মানবিক সংকটকে পুরোপুরি ভুলে যেতে বসেছে। স্থানীয় পর্যায়ের মানবিক সুরক্ষা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও সহায়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় লাখো মানুষের দুর্দশা এখন নরকীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।”

২০২১ সালে অং সান সু চি-র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিল সেনাবাহিনী। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিজেকে দেশটির নতুন ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং গত বছর এক প্রহসনের একতরফা নির্বাচন আয়োজন করেন।

প্রধান বিরোধী দলগুলোকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আয়োজিত এই নির্বাচনে আগে থেকেই জান্তার তৈরি সংবিধানে এক-চতুর্থাংশ (২৫%) আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। বাকি আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ আসনই লাভ করে জান্তা সমর্থিত দল ইউএসডিপি (USDP)। এই সাজানো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তখনই ড্রোন ও আধুনিক রুশ-চীনা বিমান ব্যবহার করে নাগরিকদের ওপর এই মেগা গণহত্যা চালায় জান্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *