হলান্ডদের ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনের রহস্য, কেন বিশ্বজুড়ে ভাইরাল নরওয়ের এই ফ্যান কালচার?

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সময় থেকেই নরওয়েজিয়ানদের মাঝে ডালপালা মেলতে থাকা এই ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনটি এখন বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে এসে নরওয়ের ফুটবল ও জাতীয় ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ২০১৬ সালের ইউরো কাপে আইসল্যান্ডের করা সেই বিখ্যাত ‘ভাইকিং থান্ডার ক্ল্যাপ’ (Viking Thunder Clap)-এর মতোই, ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের এই ‘ভাইকিং রো’ টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা আইকনিক ফ্যান কালচারে রূপ নিয়েছে।

এই উদযাপনে মাঠের ভেতর ফুটবলাররা সবাই সারিবদ্ধভাবে একে অপরের পেছনে মাটির ওপর বসেন বা হাঁটু গেড়ে বসেন। এরপর সবাই মিলে একসঙ্গে প্রাচীন ভাইকিংদের ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ বা ‘লংবোট’ (Longboat)-এর আকৃতির মতো একটি সমন্বিত ফরমেশন বা কাঠামো তৈরি করেন।

এরপর ফুটবলাররা শরীর দুলিয়ে দুই হাত দিয়ে কাল্পনিক বৈঠা বা দাঁড় চালিয়ে জাহাজটি সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার ভঙ্গি করেন। সেনেগালের বিপক্ষে আজকের জয়ের পর এই উদযাপনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দলটির অধিনায়ক ও আর্সেনালের মিডফিল্ডার মার্টিন ওডেগার্ড। তিনি মাঠের মাঝখানে বসে এত জোরে জোরেশোরে ড্রাম বাজাচ্ছিলেন যে, সেই ড্রামের তালের ছন্দ পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। অধিনায়কের ড্রামের তালের সাথে মিল রেখে গ্যালারির হাজার হাজার সমর্থকও গ্যালারির আসনে বসে একসঙ্গে দাঁড় টানার ভঙ্গি অনুকরণ করতে থাকেন।

‘ভাইকিং রো’ উদযাপনের মাধ্যমে মূলত নরওয়ের সমৃদ্ধ সামুদ্রিক ইতিহাস, পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য এবং দলগত একতা ও অদম্য শক্তির প্রতীক তুলে ধরা হয়।

  • ইতিহাসের মেলবন্ধন: নরওয়ের পূর্বপুরুষ ‘ভাইকিং’ যোদ্ধারা ৮ম থেকে ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত সমুদ্রপথে দূরপাল্লার সাহসী অভিযানের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ছিল। প্রাচীনকালে এই যোদ্ধারা যখন পাল গুটিয়ে তাদের বিশাল আকৃতির দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে শত্রুর তীরের দিকে এগিয়ে আসত, তখন যুদ্ধের ঠিক আগমুহূর্তে জাহাজের সব যোদ্ধা একসঙ্গে বসে প্রচণ্ড শক্তিতে ও একই ছন্দে দাঁড় (Rowing) টানত। এটি ছিল তাদের আক্রমণের চরম প্রস্তুতি ও শক্তির সর্বোচ্চ প্রদর্শন।
  • ফুটবলে এর প্রতীকী অর্থ: ফুটবল মাঠে হলান্ডরা যখন এই ভঙ্গিটি করেন, তখন তারা মূলত বোঝাতে চান—ফুটবল মাঠটিই তাদের যুদ্ধজাহাজ এবং দলের প্রতিটি সদস্য (খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সমর্থক পর্যন্ত) একেকজন অপরাজিত ভাইকিং যোদ্ধা। সবার সমন্বিত চেষ্টা ও একই ছন্দের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই কেবল যেকোনো কঠিন বাধা বা প্রতিপক্ষকে ডিঙিয়ে জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব।

এই ঐতিহাসিক উদযাপনটি কেবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ নেই। নরওয়ের এই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ কামব্যাকের পর উদযাপনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতেই বিশ্বজুড়ে নরওয়েজিয়ানরা মেতে উঠেছেন এতে। আমেরিকার নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে হাজার হাজার প্রবাসী নরওয়েজিয়ান একত্র হয়ে রাস্তায় বসে এই ‘রো’ পরিবেশন করেছেন। এমনকি বোস্টনের ট্রানজিট এসকেলেটরে বা চলন্ত সিঁড়িতে ওঠার সময়ও ভক্তদের একইভাবে রোয়িং করতে দেখা গেছে। এই উন্মাদনা কতটা তীব্র তা বোঝা যায় যখন খোদ নরওয়ের পার্লামেন্টেও সমস্ত প্রথা ও শৃঙ্খলা ভেঙে আইনপ্রণেতাদের (MPs) নিজ দেশের ফুটবল দলের প্রতি সংহতি জানিয়ে এভাবে একসাথে ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে অংশ নিতে দেখা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *