জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র চপেটাঘাতে ইউরোপ মহাদেশে এখন মরুভূমির মতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত রোববার ও সোমবার (২২ জুন) ইউরোপের একাধিক দেশে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। তীব্র গরমের কারণে ফ্রান্সের হাজার হাজার স্কুল সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে অথবা ক্লাসের সময়সূচিতে জরুরি পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) এক সাম্প্রতিক বিশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে—ইউরোপে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের (Global Warming) হার পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি গতিতে বাড়ছে, যার বাস্তব প্রমাণ মিলছে এই জুনেই।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, ইউরোপের বর্তমান এই চরম বৈরী আবহাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ‘ওমেগা ব্লক’ ($\Omega\text{-Block}$) নামক একটি বিশেষ বায়ুমণ্ডলীয় ব্যবস্থা। গ্রিক বর্ণ ওমেগা ($\Omega$)-এর আকৃতির মতো এই সিস্টেমে মাঝখানে তীব্র উষ্ণ বায়ু আটকে থাকে এবং দুই পাশে অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ু অবস্থান করে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রখ্যাত চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, “সাহারা মরুভূমি ও উত্তর আফ্রিকা থেকে অত্যন্ত শুষ্ক ও উষ্ণ বায়ু সরাসরি ইউরোপের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এই ওমেগা ব্লক ব্যবস্থাটি অত্যন্ত ধীর গতিতে নড়াচড়া করায় এবং বায়ুর প্রবাহ প্রায় শূন্য থাকায় মানুষের স্বস্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না।”
- বোর্ডো (France): ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলীয় বিখ্যাত ওয়াইন উৎপাদনকারী শহর বোর্দোতে তাপমাত্রা পৌঁছেছে রেকর্ড ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা গত বছরের আগস্টের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
- পোয়াতিয়ে (France): মধ্য ফ্রান্সের এই ঐতিহাসিক শহরে পারদ চড়েছে ৪১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ১৯৪৭ সালের পর অর্থাৎ গত ৭৯ বছরের পূর্ববর্তী রেকর্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।
- সান সেবাস্তিয়ান (Spain): স্পেনের তুলনামূলক শীতল উত্তরাঞ্চলীয় এই পরযটন শহরেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জুনের স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
গাড়ির ভেতর দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ও পানিতে ডুবে প্রাণহানি
এই দাবদাহের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের কার্পন্ত্রা (Carpentras) শহরে। সেখানে বাড়ির বাইরে পার্ক করে রাখা একটি বন্ধ কারের বা গাড়ির ভেতরে অচেতন অবস্থায় দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুকে উদ্ধার করেন তাদের মা। প্রচণ্ড গরমে গাড়ির ভেতর তৈরি হওয়া গ্রিনহাউজ গ্যাসের তাপে শিশু দুটি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। চিকিৎসাকর্মীরা চেষ্টা করেও তাদের বাঁচাতে পারেননি। এ ছাড়া বোর্দো অঞ্চলে তীব্র গরমে স্ট্রোক ও স্বাস্থ্য জটিলতায় ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী তিন প্রবীণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, গরম থেকে বাঁচতে নদী বা সুইমিং পুলে নামার কারণে ফ্রান্সে গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ১৩ জনের পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির সিভিল সেফটি সার্ভিস। সংস্থার মুখপাত্র জেরোম বুলাঞ্জার জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন, “শুধুমাত্র লাইফগার্ড বা তত্ত্বাবধানে থাকা নিরাপদ স্থানেই সাঁতার কাটুন।” গত বছরও তাপপ্রবাহের সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার ১৭২% বৃদ্ধি পেয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় আবহাওয়া দফতর (Met Office) এক বিশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে, দক্ষিণ ও মধ্য ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের কিছু অংশে চার দিনের টানা হিটওয়েভে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হতে পারে। এমনটি হলে ১৯৫৭ সালে স্থাপিত এবং ১৯৭৬ সালে সমতা পাওয়া জুন মাসের সর্বোচ্চ ৩৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঐতিহাসিক রেকর্ড ভেঙে যাবে। মেট অফিস ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যজুড়ে স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে। অন্যদিকে, প্রচণ্ড গরমে ইতালির রোম, মিলানসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১২টি প্রধান শহরে সোমবার থেকে সর্বোচ্চ স্তরের জরুরি অবস্থা বা ‘রেড হিট অ্যালার্ট’ (Red Heat Alert) জারি করেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
